সাফল্য-ব্যর্থতায় সরকারের এক বছর

সাফল্য-ব্যর্থতায় সরকারের এক বছর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার এক বছর পূর্ণ করল আজ। এ মেয়াদে সরকারের যেমন সফলতা আছে, আছে ব্যর্থতাও।

বর্তমান মেয়াদে সরকারের ব্যাপক সফলতার মধ্যে রয়েছে- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মেগা প্রকল্প হিসেবে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি, সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ জনসম্মুখে দৃশ্যমান করা। পাশাপাশি পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা, ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনি ও লবণ সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গুজব মোকাবিলায় সাফল্যও আছে। তবে একই বছরে পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে এ সরকারের ব্যর্থতাও কম নয়- এমনটি মনে করেন দেশের সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে কোরবানির পশুর চামড়ার দর পরিস্থিতিও সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে। তবে সফলতার কথা স্বীকার করলেও পেঁয়াজ ছাড়া অন্যান্য নিত্যপণ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই ছিল বলে দাবি সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৫৭ আসনে জয় লাভ করে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শপথগ্রহণ করে গত বছরের এই দিনে। মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) পাঁচবছর মেয়াদি বর্তমান সরকারের একবছর পূর্ণ হলো। গেল এক বছরে সফলতার কথা বললেও ব্যর্থতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চান না সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউই। তাদের বক্তব্য, সরকারে ব্যর্থতা মূল্যায়নের জন্য একবছর যথেষ্ট সময় নয়।

গত বছরের ৭ জানুয়ারি গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে শপথ নেন ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রী। পরবর্তীতে ১৯ মে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্ত না করে মন্ত্রিসভায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইদিন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সময় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এরপর ১৩ জুলাই সরকারে আবারও কিছুটা পরিবর্তন এনে নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ফজিলাতুন নেছা ইন্দিরাকে। তাকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সময় সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদক পদোন্নতি দিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর বেশ কয়েকবার মন্ত্রিসভায় রদবদল বা পুনর্গঠন নিয়ে নানামহলে আলোচনা হলেও তা আর হয়নি।

২০১৯ সালে সরকারের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিশেষ করে পদ্মাসেতুর অগ্রগতিকে সাফল্যের শীর্ষে রাখতে চান সরকারের সর্বোচ্চ মহল। ইতোমধ্যেই সেতুতে ২০টি স্প্যান বসার মধ্য দিয়ে সেতুর তিন কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার যানজট এড়াতে মেট্রোরেলের অগ্রগতিও হয়েছে নজর পড়ার মতো। এ দুটি স্থাপনাই এখন আর স্বপ্নের নয়, দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হচ্ছে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। চ্যালেঞ্জিং হলেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ আইন বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আইনটি বাস্তবায়ন হবে বলে জানিয়েছেন সেতুমন্ত্রী।

অপরদিকে জঙ্গিবাদ শতভাগ নির্মূল করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে সরকার জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, জঙ্গিরা হয়তো হামলার জন্য ঘাপটি মেরে আছে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর। তবে কোনো হুমকিও নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

গুজব অস্থিরতা সৃষ্টির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগবে বলে যে গুজব অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সরকার তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। বিষয়টি যে স্রেফ গুজব তা দেশের মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। তা না হলে সমাজের বড় ক্ষতি হতে পারত বলেও মনে করেন তিনি।

এবছর কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি সরকারকে বিব্রত করেছে স্বীকার করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, বিব্রত করেছে পেঁয়াজের দরও। তবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই ছিল।

তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীরা কথা দিয়েছিলেন নির্ধারিত মূল্যেই কোরবানির পশুর চামড়া কিনবেন, কিন্তু তারা কথা রাখেননি। অপরদিকে পেঁয়াজের বিষয়টিও একইরকম। ভারত কোনো ধরনের পরামর্শ, আলোচনা বা না জানিয়ে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিল। জানিয়ে করলে হয়তো আমরা একটা প্রস্তুতি নিতে পারতাম। এ দুই বিষয় থেকে শিক্ষা নিলাম।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *