রিকশায় চলেন মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দি ও শেখ মুজিব

রিকশায় চলেন মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দি ও শেখ মুজিব

অজয় দাশগুপ্তঃ 

১৯৫৩ সালের আগস্ট মাস। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান রিকশায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরছেন দলীয় কাজে – তারই বিবরণ ফুটে উঠেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। দুই নেতার পেছনেই গোয়েন্দারা সর্বক্ষণ লেগে থাকত।

মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব হাটখোলায় প্যারামাউন্ট প্রেসে পৌঁছালে তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া স্বাগত জানান। মানিক মিয়া – আমার কাছে ক্যামেরা থাকলে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব এক রিকশায় ঢাকায় ঘুরছেন, এই ঐতিহাসিক ছবি তুলে রাখতাম। মজিবর মিয়া সব সময় রিকশায় চলাচল করেন। না হয় বাসে ওঠেন। আওয়ামী লীগ কী কষ্টের ফসল, এটা তার প্রমাণ।

ভাসানী – ঠিক বলেছ। এ সব তোমাকেই লিখতে হবে।

মুজিব বিকেল ৬টায় আবার আসেন ১৮ কারকুনবাড়ি লেনে। ঢাকায় এলে এখানেই থাকেন ভাসানী সাহেব। অনেক কর্মীর ভিড়। কয়েকজন নেতাও আছেন।

মুজিবকে এক নেতা – আবার বের হবেন? আমার নমিনেশনের বিষয়টা হুজুরকে বলবেন একটু।

মুজিব – হুজুরকে নিয়ে ডা. নন্দীর চেম্বারে যাব।

এক নেতা – রিকশায় কেন যাবেন? আমি ট্যাক্সি ভাড়া করে দিই।

মুজিব হেসে বলেন – আমি তো রিকশাতেই ঘুরি। ভাসানী সাহেব আজ আমার সঙ্গে সব জায়গায় রিকশায় যাবেন, এমন চুক্তি হয়েছে।
র‌্যাংকিন স্ট্রিটে ডা. নন্দীর চেম্বারে রিকশা থেকে নামেন শেখ মুজিব ও ভাসানী। অনেক রোগী, উঠে দাঁড়ায়। সালাম দেয়। ভাসানীর পায়ে হাত দেয় অনেকে।

ডা. নন্দী রোগীদের – আমার এই পুরাতন বুড়ো রোগীকে আগে দেখে দিই। আপনারা একটু বসুন।

ভাসানী – ডাক্তার, তোমার সাপে কাটার ওষুধ খুব কাজ দিয়েছে। আমার বিবি সাহেবাকে সাপে কামড় দিয়েছে – মজিবর খবর পেয়েই সব ব্যবস্থা নিয়েছে।

ড. নন্দী – এখন আপনার সমস্যা বলেন?

তিনি প্রেসার মাপেন ভাসানীর।

ডা. নন্দী – একটু বেশি। ইলেকশন সামনে। জেলায় জেলায় যাবেন। তবে ওষুধ সব সময় সঙ্গে রাখবেন।

ভাসানী – এখন মুজিবরকে দেখে দিন। তার ওপর দিয়ে ঝড় নয়, মহা ঝড় যাচ্ছে।

মুজিব – ডাক্তার, আজ আমরা দুই জনে ঢাকা শহর রিকশায় ঘুরেছি। শুক্রবার। সকালে আমি ওনাকে রেল স্টেশন থেকে তুলেছি। মানিক মিয়ার কাছে গেছি। জুমার নামাজ পড়েছি। আপনার এখানে এলাম। রিকশাতেই চলেছে রাজনৈতিক ও সংগঠনের সব আলোচনা। এখন মন ভাল, শরীরও ভাল। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১১ টা। এক ঘণ্টা বই পড়ে ঘুম দেব।

ভাসানী – শুধু একটাই বিপদ মজিবরের যখন ধূমপানের ইচ্ছা হয়, আমাকে রেখে দূরে যেতে হয়। যদি বলি, খাও সামনে – দোষ নাই। কিছুতেই মানে না।

ডা. নন্দী ও ভাসানী হেসে ওঠনে। মুজিব মাথা নিচু সলাজ।

ডা. নন্দী – আপনার হুজুর যতদিন ঢাকায় থাকবেন, এই রুটিনই তো চলবে। দুই জনেই ভাল থাকবেন।

ভাসানী – বিবি সাহেবাকে সাপে কাটার খবর দলের অনেক নেতাকে জানিয়েছি। কিন্তু কেবল মজিবর আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে ওষুধ পাঠিয়েছে। ঢাকা আমার ভাল লাগে না। থাকি টাঙ্গাইলের সন্তোষ না হয় বগুড়ার পাঁচবিবি। মজিবর সব সময় যোগাযোগ রাখে। ওর স্বাস্থ্য যাতে ঠিক থাকে, দরকার পড়লে জোর করবেন।

ভাসানী অপেক্ষমান রোগীদের – তোমাদের দেরি করিয়ে দিলাম। এমন ডাক্তারের কাছে আসলে ব্যারাম তো এমনিই অর্ধেক ভাল হয়ে যায়। চল মজিবর, আমাকে পৌঁছে দিয়ে তোমাকে তো আবার বাড়ি ফিরতে হবে।

রিকশায় সোহরাওয়ার্দি ও মুজিব

ঢাকার গোয়েন্দা অফিস।

এক অফিসার – কেমন মনে হলো আওয়ামী লীগের কাউন্সিল?

আরেক অফিসার – মুসলিম লীগের জন্য অশুভ বার্তা দিল।

আরেক গোয়েন্দা – ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দি এত বড় নেতা। কিন্তু সব কিছু শেখ মুজিবের নিয়ন্ত্রণে সম্পন্ন হয়ে গেল।

আরেক গোয়েন্দা – সালাম খান কয়েকজন নেতাকে নিয়ে এত ট্রিক্স করলেন। কোনো কাজে আসল না। বেশিরভাগ জেলা ও মহকুমার নেতা এখন শেখ মুজিবের পক্ষে। তিনি কাজ করেছেন, ফল পাচ্ছেন।

অফিসার – আওয়ামী লীগ নেতারা ঢাকা ফিরেছেন?

এক গোয়েন্দা – ১৭ নভেম্বর শেখ মুজিব সকাল পৌনে আটটায় বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছেন জয়নাগ রোডে। সেখান থেকে গেছেন ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে। তারপর দুই নেতা গেছেন রমনা রেস্ট হাউসে। সেখানে সোহরাওয়ার্দি সাহেব রয়েছেন। তিন নেতা প্রায় তিন ঘণ্টা একান্তে কথা বলেন। তারপর মুজিব বাসায় ফিরে আবার যান ভাসানীর কাছে, কারকুন বাড়ি লেনে। সেখানে ভাসানীর সঙ্গে কথা বলে দু’জনে যান সোহরাওয়ার্দি সাহেবের কাছে।

আরেক গোয়েন্দা – পরের দিনও শেখ মুজিব সকালে বাসা থেকে বের হয়ে হোটেলে চা-নাস্তা খেয়ে সারা দিন ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে বার বার আলোচনা করেন। মাঝে কিছু সময় মানিক মিয়ার অফিসে কাটান। বিকেলে সোহরাওয়ার্দি ও শেখ মুজিব রিকশায় শেখ মুজিবের রজনী বসু রোডের বাসায় যান।

অফিসার – ভাসানী ও মুজিব রিকশায় চলাফেরা করেন, শুনেছি। সোহরাওয়ার্দি সাহেব বিখ্যাত উকিল, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তিনিও রিকশায় চলাচল করেন?

আরেক গোয়েন্দা – শেখ মুজিব ও সোহরাওয়ার্দির পেছনে আমাদের ওয়াচার ছিল সাইকেলে। অনেক মানুষ তাদের দিকে হাত নেড়েছে। ছুটে এসে সালাম দিয়েছে। রিকশাওয়ালা ভাড়া নিতে চায় নাই। দুই নেতা যখন মুজিবের বাসার সামনে নামেন, অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে অল্প সময়ের মধ্যে।

অফিসার – আমি তো শুনেছি জনসভার মতো ভিড় থাকে মুজিবের বাসার সামনে।

গোয়েন্দা – ইলেকশনে যারা নমিনেশন চায়, বুঝে গেছে শেখ মুজিবের ক্ষমতা। সবাই এখন মুজিবকে খুশি রাখতে চায়।

সূত্র : গোয়েন্দা প্রতিবেদন, তৃতীয় খণ্ড

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *