বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা হলেও বইটি প্রকাশ হওয়ায় ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পাই

বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা হলেও বইটি প্রকাশ হওয়ায় ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পাই

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়াচীনসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বইগুলো প্রকাশিত হবার পর ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে আমরা কিছুটা রক্ষা পাই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার (৭ অক্টোবর) বঙ্গবন্ধুর অসামপ্ত আত্মজীবনীর ব্রেইল সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্ববধানে ৬ খণ্ডে এই ব্রেইল সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সুবিধার্থে এই বই প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকের আগে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার সভাকক্ষে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামাদ আহমেদ ও অন্যান্য মন্ত্রীগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ব্রেইলে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে আমাদের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরাও পড়তে পারে এবং এর সম্পর্কে জানতে পারে। এটা একটা মহৎ উদ্যোগ। জাতির পিতা আমাদের মহান স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে তার জীবনের অনেক অধ্যায়গুলো সেগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছি। বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায় করতে গিয়ে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছিল। আমার মা সব সময় অনুপ্রেরণা দিতেন যে তিনি যেন তার জীবনীটা লিখে রাখেন। সেই থেকে তিনি লিখতে শুরু করেন এবং যতবার কারাগার থেকে মুক্তি পেতেন আমার মা জেলগেটে উপস্থিত থেকে আর কিছু না হোক লেখার খাতাগুলো তিনি সংগ্রহ করে রাখতেন।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে এই খাতাগুলো প্রায় হারাতে বসেছিল, সে সময় আমরা এটা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলাম। যদিও আমাদের ধানমন্ডির বাসায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সবকিছু লুটপাট করে। কিন্তু এই লাইনটানা নোট খাতাগুলো ওদের নজরে পড়েনি, ওদের কাছে এগুলোর কোনো মূল্য ছিল না। যা হোক এক সময় সেটা আমি উদ্ধার করে নিয়ে আসি। সেগুলো বিস্তারিত অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছি, কিভাবে এটা উদ্ধার করা হয়, কিভাবে রাখা হয়।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা হত্যার পর আমাদের বাসায় আবার লুটপাট করে, আমি যখন ১৯৮১ সালে ফিরে আসি, প্রথমে আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিল। সেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে খুনিদের বিচারের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল। আমরা ১৯৮১ সালে ফিরে আসার পর ওই বাড়িতে আমাদের ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল, আমি ঢোকতে পারিনি। ওটা সিলগালা করে দেওয়া ছিল। তখন হঠাৎ করে ১২ জুন তাদের কি মনে হল বাসাটা খুলে দিল, আমি প্রথম তো ঢোকতে পারিনি, সেদিন ঢোকতে গিয়ে আমি ওখানে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তারপর আমি যখন যাই দেখি খাতাগুলো কোথায় আছে, সেটাই আমার কাছে সব থেকে মূল্যবান ছিল। অন্যকিছু না এই খাতাগুলো সংগ্রহ করি। কতগুলো কাগজ পেয়েছিলাম যেগুলোর প্রায় সবগুলো পোকায় কাটা, প্রায় অকেজো। এরপর আমি খাতাগুলো খুঁজে বেড়াই। কারণ আমি জানতাম যে শেখ ফজলুল হক মনির কাছে দেওয়া হয়েছিল টাইপ করতে এবং বই আকারে প্রকাশ করতে। আমি বাড়িতে খুঁজি এবং যে টাইপ করেছে, যেখানে নাম পেয়েছি আমি এবং আমার বান্ধবী বেবী মওদুদ অনেক জায়গায় খুঁজে। বেবী মওদুদও খুব চেষ্টা করে যে কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় কি না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. এনায়েতুর রহিম সাহেব তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ওপর গবেষণা করতে, তখন তার সঙ্গে বসে কাজ শুরু করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের যত রিপোর্ট সেইগুলো আমি সংগ্রহ করেছিলাম। ফটোকপি করি এবং সেটা আমার কাছে রেখে দেই, যাতে ওটার ওপর কাজ করতে পারি এবং তথ্য সংগ্রহ করতে পারি।

ড. এনায়েতুর রহিম বঙ্গবন্ধুর ওপর গবেষণা করতে আসেন। এরমধ্যে ২০০১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর যে চেয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খালেদা জিয়া চেয়ারটা বন্ধ করে দেয় এবং এনায়েতুর রহিম সাহেবকে দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য করেন। আমি তখন আমেরিকায় যেতাম ওনার সঙ্গে কাজ করতাম এবং ট্রান্সসিলেশন করা এবং সেগুলো বই আকারে প্রকাশ করার ব্যবস্থা নিই। এরমধ্যে তিনি মারা যান তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুন সাহেব, শামসুজ্জামান খান সাহেব, বেবী মওদুদ এবং আমি চারজন এক সঙ্গে বসে কাজ করতাম।

তিনি বলেন, ২০০৪ সালে ঠিক আমি যখন গ্রেনেড হামলায় বেঁচে যাই তার পরপর আমাকে এই খাতাগুলো এসে একজন দেয়, সে আমার ফুফাতো ভাই। সে হচ্ছে মারুফ। ওর কাছে খাতাগুলো রাখা ছিল, অথচ ওর কাছে বারবার গেছি, ওর বাসায় গেছি অনেকবার খোঁজ করেছি কিন্তু কখনো সেটা বের করেনি। কি মনে করে সেদিন আমার হাতে দিয়ে গেল। তারপর সমস্ত কাজ ফেলে অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে কাজ শুরু করি, কিন্তু খাতাগুলো এমন অবস্থায় ছিল কিছু কিছু পাতা তো একেবারেই ছিন্ন জীর্ণ অবস্থা। আমি আর বেবী মওদুদ বসে এটা নিয়ে দিনে পর দিন কাজ করেছি। সেগুলো উদ্ধার করতে খুব কষ্ট হয়েছে। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দিয়ে সেগুলোকে ফটোকপি করে নোট আকারে চেষ্টা করে স্ক্যান করে বের করে এগুলো আমরা তৈরি করি। এরপর আমরা এই খাতাগুলো প্রকাশ করি এব অসমাপ্ত আত্মজীবনী নামটা রেহানার দেওয়া ছিল। আমরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেই যে এই নাম দিয়ে প্রকাশ করব। এই বইয়ের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার জীবনী গাঁথা আছে পাশাপাশি তার সংগ্রামের অনেক কথা আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন সে আন্দোলনের অনেক তথ্য এখানে পাওয়া যায়। এই বইটি প্রায় ১৪টা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। এবং আরও কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ করার জন্য আমাদের কাছে অনুমতি চেয়েছে। যারাই এটা করেছে তাদের কাছে এটা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা হত্যার পর বাংলাদেশে যে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সেগুলো বিকৃত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নাম সব জায়গা থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। বইটি প্রকাশ হবার পর সেই ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে কিছুটা আমরা রক্ষা পাই।

জাতির পিতার জীবনী তার সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান আমরা বাঙালি জাতি হিসাবে আমাদের আত্মপরিচয়। আমরা যে একটা স্বাধীন জাতি হতে পেরেছি এই ইতিহাস জানার একটা সুযোগ রয়ে গেছে এসব প্রকাশের মাধ্যমে। ব্রেইলে বই প্রকাশ করার ফলে আমাদের সমাজের একটা মূল্যবান গোষ্ঠী যারা পড়াশোনা করছে তারাও ইতিহাসটা জানার সুযোগ পাবে। তারাও যে আমাদের একজন সেটাই আরও একবার প্রমাণিত হল। বিভিন্ন লাইব্রেরিতে যদি এটা রাখা যায় যেখানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা সংগ্রহ করতে পারবে পড়তে পারবে। লাইব্রেরিতে থাকলে জানতে পারবে পড়তেও পারবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *