‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবে না, সংবিধানের বাইরেও যাবে না’

‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবে না, সংবিধানের বাইরেও যাবে না’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়ে আলেমরা আর আন্দোলন করবেন না দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, তাদের পাঁচটি প্রস্তাবনা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। সরকার কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবে না এবং সংবিধানের বাইরেও যাবে না।

সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) রাতে ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। পরে মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা জানান মন্ত্রী।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে বেফাকের সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে দেশের ১২ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম মতবিনিময় করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ৫ ডিসেম্বর সারাদেশে শীর্ষস্থানীয় আলেমরা দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠির বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য আমার কাছে গিয়েছিলেন।

‘ফলপ্রসূ আলাপ হয়েছে। আমরা যে সমস্ত আলাপ করেছি, আরো আলাপ হবে। আমরা মনে করি আলাপের মাধ্যমে সব সমস্যা সমাধান করতে পারবো। আমরা ঐক্যে পৌঁছাতে পারবো। আলাপ-আলোচনার মধ্যে যে সমস্ত কথাবার্তা বেরিয়ে এসেছে সে বিষয়ে আমরা ঐক্যে পৌঁছাতে পারবো। ’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারাও হৃদয় দিয়ে ধারণ করেন বাঙালির জাতির পিতাকে। তারাও স্বীকার করেন যে প্রধানমন্ত্রী একজন খাঁটি মুসলমান, তার ঈমানি দায়িত্ব তিনি পালন করে যাচ্ছেন। আলাপের মাধ্যমে ঐক্য যেটুকু হয়েছে, যে সমস্ত প্রশ্ন আছে সেগুলো আরো আলাপের মাধ্যমে শেষ করতে পারবো ইনশাল্লাহ।

কোন কোন বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে- প্রম্নে তিনি বলেন, আলাপ-আলোচনা যে শুরু হয়েছে, এটা চলবে।

তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের পরিবর্তে মুজিব মিনার করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তারা কী এখনও সেই অবস্থানে আছেন- প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারা দেখা করতে চেয়েছেন। সবকিছুই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবো।

‘তারা এই আবেদন রেখেছেন, কেউ যাতে রাস্তায় নেমে এসে ভাঙচুর না করেন। কেউ যেন এসে কোনো ধরনের শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে, এ ব্যাপারে তারা আমাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ ঐকমত্যে এসেছেন। ’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফেসবুকে নানা ধরনের উত্তেজনা ছড়ানোর যে প্রয়াস চলছে, সেইগুলোর বিরুদ্ধে তারাও কথা বলেছেন। তারা বলেছেন এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে। কোথাও যাতে সরকারবিরোধী আন্দোলন কেউ না করেন সেই আহ্বানও তারা রেখেছেন।

তিনি বলেন, পাঁচটি প্রস্তাবনা তারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই শেষ কতে চান। আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। আশা করি আলোচনার মাধ্যমেই ফয়সালা করতে পারব।

এর মানে তাদের দাবিই শেষ পর্যন্ত মানতে হচ্ছে- প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, সেটা আমি বলিনি। বলেছি আলোচনার মাধ্যমে আমরা শেষ করবো।

সরকার কী নতজানু নীতি নিয়েছে- জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রশ্নই আসে না। সরকার কখনও নতজানু নীতিতে বিশ্বাস করে না।

‘আমরা সংবিধানের বাইরে যাবো না। আমরা কারো ধর্মীয় সেন্টিমেন্টেও আঘাত করতে চাই না। আলোচনার মাধ্যমে শেষ করতে চাই। ’

যারা জাতির পিতার ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিতে বলেছে, যারা ভেঙেছে তাদের সঙ্গে আলোচনা সরকারের নতজানু নীতি কিনা- প্রশ্নে স্বরাষ্টমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ কখনও নতজানু রাজনীতি করে না। আমাদের সরকার সবকিছু স্পষ্টভাবে সবকিছু জানিয়ে দিয়ে করে। আমরা সংবিধানের বাইরে কোনো কিছুই করবো না। তার মানে এই নয় যে আমরা কোনো ধর্মকে অবজ্ঞা করবো।

‘আমরা ধর্মীয় সংস্কৃতি মেনে, ধর্মীয় বিধান মেনেই চলছি এবং আলেম-ওলামারা এটাও স্বীকার করে গেছেন যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করেন, তাহাজ্জুদের নামাজটাও পড়েন। তারা মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে আবেদন করেছেন তা আলোচনার মাধ্যমে শেষ হবে। আমরা আলোচনা শুরু করেছি, আলোচনার নিশ্চই একটা ফলপ্রসূ রেজাল্ট আপনারা দেখবেন। ’

ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে সরকার দোটানায় আছে কিনা- প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, আমরা সংবিধানের বাইরে যাবো না। কারো ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত দেবো না। ভাস্কর্য যেখানে যেভাবে আছে সেভাবে থাকবে কি থাকবে না, আমরা সবগুলো নিয়ে আলোচনা করছি।

তিনি বলেন, স্পষ্ট কথা হলো- ভাস্কর্য কেন করা হয়? এটাকে কিন্তু পূজা করা হয় না। এটা মূর্তি নয়। আমরা বলছি জন্ম জন্মান্তরে বঙ্গবন্ধু কে ছিলেন, হৃদয়ে ধারণ করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখতে চাচ্ছি।

‘তারা বলেছেন মূল ভাস্কর্যের জায়গায় একটি মুজিব মিনার করার জন্য, আমরা বলেছি আলোচনার মাধ্যমে শেষ করবো। ’

ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়ে সরকার নমনীয়- এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, নমনীয়ের কথা আমি বলিনি। সেখানে ভাস্কর্য থাকবে না- এটা আমি কখনও বলিনি। আমি স্পষ্ট করে বলছি, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি যে ভাস্কর্য ওখানে থাকবে না, ওখান থেকে সরিয়ে দেবো। কোন সিদ্ধান্ত হয়নি এই জায়গায় অন্য কিছু হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারা দেখা করতে চেয়েছেন, আমরা প্রস্তাব দেবো। তিনি রাজি হলে দেখা করবেন। কোভিড-১৯ এর কারণে প্রধানমন্ত্রীকে সুস্থ রাখাও আমাদের কর্তব্য। উনি যদি দেখা করতে ইচ্ছা পোষণ করেন তাহলে নিশ্চয়ই দেখা হবে।

দেখা করার বিষয়ে আপনাকে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব দিয়েছেন কিনা- প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাকে দায়িত্ব দেবেন কেন। অনেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত আছে। যেহেতু শান্তি-শৃঙ্খলার বিষয়টি আসছে সেহেতু আমি সামনে চলে এসেছি।

এই পরিস্থিতিতে ভাস্কর্য নির্মাণ কাজ কি চলমান থাকবে- প্রশ্নে তিনি বলেন, চলমান তো আছেই। সেগুলো সবই আপনারা দেখছেন।

বিকল্প প্রস্তাবে মিনার ও ভাস্কর্য কি একসঙ্গে থাকবে- প্রশ্নে তিনি বলেন, না। আমরা বলছি কোনোটাই সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা নিয়ে আরো আলোচনা হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটা বড় পরিসরে আলাপ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *