গরিবদের সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ধনীরা

গরিবদের সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ধনীরা

করোনাভাইরাসের প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ লকডাউন হয়ে পড়ায় কর্মহীন দরিদ্র মানুষের দুর্দশা বাড়ছে। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্যসংকটে ভুগছে ঘরবন্দি অনেকে। জাতির এই ক্রান্তিকালে দরিদ্রদের সহায়তায় বিত্তবানরা বড় ধরনের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে না আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তর সমালোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এরপর থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থদান করা ব্যবসায়ীরা। তাদের কেউ কেউ সাংগঠনিকভাবে তহবিল গঠন করেছেন, কেউবা অপেক্ষা করছেন লকডাউন শেষে বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার। আবার কোনো কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন অনুদান দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার হতদরিদ্রদের বিনা মূল্যে চাল, ওষুধ ও আবাসনের ব্যবস্থা করার কথা বলেছে। কিন্তু শহুরে দরিদ্রদের মধ্যে যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তারা এর আওতায় পড়বে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। আর শহুরে দরিদ্রদের অবস্থা গ্রামীণ দরিদ্রদের চেয়ে বেশি খারাপ। কারণ, গ্রামে বোরো মৌসুম চলছে, সেখানে এখনো শ্রমিকের চাহিদা আছে। কিন্তু শহরের শ্রমিক ও দিনমজুর শ্রেণির আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার মাধ্যমে দরিদ্রদের সহায়তা দিলে শহরে দরিদ্র বা শহর থেকে গ্রামে যাওয়া কর্মহীনরা এই সুবিধা পাবেন না। কারণ, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার গরিবের তালিকায় তাদের নাম নেই। তাই এখন জরুরি হলো এনজিও বা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে শহুরে দরিদ্রদের দ্রুত তালিকা সংগ্রহ করে তাদের নগদ সহায়তা দেওয়া। কারণ, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া শহুরে দরিদ্রদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ জন্য বিত্তবানদের সহায়তায় হোক বা দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় হোক সরকারকে দ্রুত এসব উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে অনুদান নেওয়া হবে। এই তহবিলে বিত্তবানসহ যে কেউ সহায়তা দিতে পারবেন। কেউ সহায়তা করতে আগ্রহী হলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা সেই অনুযায়ী উদ্যোগ নেব।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট সালমান এফ রহমান গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশের করপোরেট খাত তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে ভীষণভাবে সচেতন। এ ধরনের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় তারা সবসময়ই জাতীয় উদ্যোগে শামিল হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, বেক্সিমকো গ্রুপের এই উদ্যোগ অন্যান্য ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানকেও তাদের সাধ্যমতো এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের সহায়তায় এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, তারা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ১০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আজ রবিবার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর প্রধানমন্ত্রীর হাতে ১০ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করবেন।

পিলখানা ট্র্যাজেডি, রানা প্লাজা ধসসহ দেশের সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সবচেয়ে বেশি অনুদান দেয় বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের এই সময়ে আমরা অবশ্যই হাত গুটিয়ে বসে থাকব না। কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্রদের পাশে সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা নিয়ে পাশে থাকব। তবে এখনো সদস্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করিনি। এখন তো সবকিছুই বন্ধ, এ অবস্থায় বৈঠকও ডাকা যাচ্ছে না। তবে খুব শিগগির আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করব।’

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিচালকদের আর্থিক সহায়তায় ইতিমধ্যেই আমরা একটি তহবিল গঠন করেছি। এই তহবিল থেকে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ করছি। শনিবারও আমরা সুনামগঞ্জে ৫০০ দরিদ্র পরিবারকে খাবার সরবরাহ করেছি। জেলা চেম্বারগুলোকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি যাতে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রত্যেকে সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায়দের পাশে দাঁড়ান।’

হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের এই সময়ে দরিদ্রদের পাশে থাকতে একটি তহবিল গঠন করেছি। তহবিলের আকার বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করছি। আপাতত হাসপাতালগুলোতে পিপিই সরবরাহ করছি। খাদ্যপণসহ কীভাবে সহায়তা দিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি।’

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট সংগ্রহে ২৫ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। আরও অনুদান দেওয়ার জন্য গতকাল সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট আলমগীর শামসুল আলামীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এ বিষয়ে রিহ্যাব সভাপতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের এই সময়ে সহায়তা করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে আজকেই আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে আমাদের কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে একটি উদ্যোগ নেবেন।’ তিনি বলেন, এই সংকটকালে সবারই এগিয়ে আসা উচিত। সবাই যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে এলেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জসিম উদ্দিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপাতত আমরা নোয়াখালীতে আমাদের এলাকার গরিব মানুষদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছি। বিশেষ করে, যারা আগে ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত, কিন্তু এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তাদের চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ খাদ্যপণ্য সরবরাহ করছি। আর জাতীয়ভাবে কীভাবে সহায়তা করতে পারি, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চললেও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। সরকারের সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) জিয়াউল হক জানান, আমাদের গ্রুপের পক্ষ থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হচ্ছে। নাটোরে আমজাদ খান মেমোরিয়াল হাসপাতালে ২০ আসনবিশিষ্ট আইসোলেশন সেন্টার তৈরির কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কাজে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এখন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনুমোদন নেওয়ার কাজ চলছে। অনুমোদন পেলে আগামী মাসের প্রথম দিকেই এটি চালু করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া, হবিগঞ্জে প্রাণ গ্রুপের কারখানা সংলগ্ন এলাকায় গাড়ির মাধ্যমে নিয়মিত জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘প্রাণ-আরএফএল অনেক খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে। আমাদের উৎপাদিত নুডলস, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিতরণ করছি। যেহেতু বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞ, তাই আমরা নিজেরা না করে তাদের মাধ্যমে বিতরণ করছি।’

বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা গতকাল ১৫ কোটি টাকা মূল্যের পিপিই সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গ্রুপটির চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রয়োজনের সময় সাড়া দিতে পেরে আমরা গর্বিত। দায়িত্বশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা এই সাংঘাতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আন্তরিকভাবে সহায়তা প্রদান করা অব্যাহত রাখব।’

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের এই সময়ে সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। দেশে অনেক হৃদয়বান, বিত্তবান মানুষ আছেন। তাদের উচিত এই ক্রান্তিলগ্নে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এমন দুর্যোগ স্মরণকালে আর আসেনি। এই সময় কেউ অল্প সহায়তা করলেও তা অনেক বড় কাজে দেবে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে তহবিল গঠন করেছে বেসরকারি খাতের এনআরবিসি ব্যাংক। তহবিলে ব্যাংকটির সব কর্মী তাদের এক দিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দান করছেন। এ ছাড়া ব্যাংকটির পরিচালকরা ৪৫ লাখ টাকা দান করেছেন। এই তহবিলে অর্থ সহায়তা করতে পারবেন সমাজের যেকোনো হৃদয়বান ব্যক্তি। এই তহবিলের পুরো অর্থ জনস্বার্থে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে খরচ করা হবে এবং হালনাগাদ তথ্য ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। তহবিলের অর্থ অব্যয়িত থাকলে অন্য জনকল্যাণকর কাজে ব্যয় করা হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *