উন্নয়নের কথা তুলে ধরুন- জনগণ যেন নৌকায় ভোট দেয়

উন্নয়নের কথা তুলে ধরুন- জনগণ যেন নৌকায় ভোট দেয়

২৩ জুন ২০১৮, গণভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা এমপি’র ভাষণের পূর্ণ বিবরণ-

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আজকের বিশেষ বর্ধিত সভার আয়োজন করা হয়েছে। এই বর্ধিত সভায় আপনারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় কমিটির সদস্যবৃন্দ, জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, দলীয় ও জাতীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, সংসদীয় দলের সদস্যবৃন্দ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নারী-পুরুষ উভয়ই, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার দলীয় মেয়র, সকল মহানগর অন্তর্গত প্রতিটি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সকল সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ যারা আজকে এই গণভবনে উপস্থিত আস্সালামু আলাইকুম। সবাইকে স্বাগত জানাই এবং আমার গণভবন হচ্ছে জনগণের ভবন। আপনাদের এই পদচারণায় গণভবন আজ ধন্য। কারণ আমি এটা বিশ্বাস করি যে, আপনাদের মহান ত্যাগের বিনিময়েই আমরা সরকার গঠন করেছি।
আমার বক্তব্যের শুরুতে আজকের দিনে আমি শ্রদ্ধা জানাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা পেয়েছি। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতি। শ্রদ্ধা জানাই আওয়ামী লীগের প্রথম যিনি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সামছুল হক সাহেবকে। শ্রদ্ধা জানাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি। জাতীয় চার নেতার প্রতি এবং ১৯৪৮ থেকে যে ভাষা আন্দোলন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল, ’৫২-তে রক্ত দিয়ে যে ভাষা অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেই ভাষা আন্দোলন থেকে নিয়ে ৬-দফা আন্দোলন, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছে তাদের সকলের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট পিতা-মাতা, ভাই সব হারিয়েছিলাম। তাদের প্রতিও আজকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ২১শে আগস্ট আইভি রহমানকে হারিয়েছি এবং বারবার আমার ওপর যে আঘাত এসেছে সেই আক্রমণে বহু নেতাকর্মী জীবন দিয়েছে, সেই চট্টগ্রামÑ ’৮৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ওপর যে আঘাত এসেছে, যারা শাহাদাতবরণ করেছে তাদের সবাইকে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। স্বজন হারাবার বেদনা নিয়ে যারা বেঁচে আছে, তাদের প্রতি জানাই আমার সহমর্মিতা।
বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে আওয়ামী লীগের ইতিহাসই প্রকৃতপক্ষে লেখা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে জাতির পিতার জীবনীই প্রকৃতপক্ষে লেখা হয়। একজন মানুষ একটি জাতির জন্য কীভাবে কষ্ট শিকার করেছেন আর তার সাথে যারা তার সাথী ছিলেন, তারাও দিনের পর দিন কারাবরণ এবং নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু একটা লক্ষ স্থির রেখে জাতির পিতা এই দেশকে স্বাধীন করেছেন। আসলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য। আমরা যদি একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই, সেই ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে যে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, সিরাজ-উদ-দৌলার পতন হয়েছিল। সেই স্বাধীনতার সূর্য আবার উদিত হয়েছে যখন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনের বাড়িতে। যেই সময় এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন অবশ্য নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা ভাসানী সভাপতি এবং সামছুল হক সাহেব সাধারণ সম্পাদক আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যুগ্ম সম্পাদক। তিনি তখন ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবন্দি ছিলেন। কারাবন্দি অবস্থায় তাকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তার আর্থ-সামাজিক নীতি এবং সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী করেছে। ২৩শে জুন ’৪৯ সালে যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছিল সেই প্রতিষ্ঠান নিয়েই কিন্তু ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। সেই যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে এবং সরকারও গঠন করে কিন্তু কেন্দ্রীয় পাকিস্তানি শাসকদের কারণে সে সরকার টিকতে পারেনি। এমনকি ’৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ গঠিত হবার পর সমগ্র পাকিস্তানের জন্য আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে।
১৯৫০ সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার সভাপতি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহমুদুল হক ওসমানী। তাদেরকে নিয়ে ’৫০ সালে নিখিল পাকিস্তান অর্থাৎ সর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগকে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ১৯৫৫ সালে যে কাউন্সিল অধিবেশন হয়, সেই কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয়। তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান এবং নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মুসলিম শব্দটি সেখান থেকে বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নামটা রাখা হয়েছিল। যার ফলে আওয়ামী লীগ সকল ধর্মের মানুষ; সকলেই যেন এই সংগঠনের সদস্য হতে পারে সেটা মাথায় রেখেই এই পরিবর্তনটা আনা হয়েছিল। এটা যেমন পূর্ববঙ্গেও করা হয়েছিল এবং নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যেটা সেখানেও করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ ’৫৬ সালে সরকার গঠন করেছিল। আমরা জানি বাঙালির বিভিন্ন অর্জনের কথা চিন্তা করি আমরা দেখব, এই অর্জনগুলি যা কিছু পেয়েছে আওয়ামী লীগ যখন সরকারে এসেছে তখনই কিন্তু পেয়েছে। এই ’৫৬ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। শহীদ মিনার করবার জন্য তার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং বাজেটে টাকাও দেওয়া হয়। শহীদ মিনার নির্মাণকাজও কিন্তু শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। পাকিস্তানের প্রথম যে শাসনতন্ত্র, সেই শাসনতন্ত্র রচিত হয়েছিল সেই ’৫৬ সালেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছিল। যেহেতু পাকিস্তান ছিল উর্দুর সাথে, তাই একই সাথে সেটা দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই আমরা দেখি যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ দেশের মানুষের প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভাষার অধিকার থেকে এই আন্দোলন শুরু। জাতির পিতা সব সময় একটা জিনিস লক্ষ রাখতেন যে কীভাবে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করবেন। তিনি ’৫২ সালের যে আন্দোলন ভাষার জন্য, সে আন্দোলন সম্পর্কে তার একটি বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, এটা ছিল ’৭২ সালে ২০শে ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ শহীদ মিনারে যখন পুষ্পমাল্য অর্পণ করতে যান ২১শে ফেব্রুয়ারি তখনই তিনি বক্তব্যটা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৫২ সালের আন্দোলন কেবলমাত্র ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।’ অর্থাৎ ওই আন্দোলন থেকেই কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের যাত্রা শুরু। এটা জাতির পিতার সেই বক্তব্যের মধ্য থেকেই আমরা জানতে পারি।
স্বাধীনতার পর তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এবং যে সংবিধান আমাদের উপহার দিয়েছেন সেই সংবিধানের মধ্য দিয়েই কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির কথাই বলে গেছেন। আপনারা যদি একটু লক্ষ করেন যে, আপনারা নিশ্চয়ই অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েছেন এবং কারগারের রোজনামচা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিজের হাতে লেখা। কারাগারে বসেই তিনি লিখেছেন এই ডায়েরিগুলি। আমি একটা একটা করে সেটা প্রকাশ করছি। সেগুলি পড়লেই আপনারা দেখতে পারবেন, জানতে পারবেন তার জীবনের ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের সাথেই বাঙালির অর্জনের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। নইলে বাংলাদেশের মানুষের কী ছিল?
আমি একটা হিসেব আপনাদের দেই। ’৫৬ সালে তখন করাচি ডন পত্রিকায় একটি সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল। সেখানে বাঙালিদের অবস্থাটা কী ছিল? বাঙালি যে শোষিত, বঞ্চিত, বাঙালি যে সবসময় বঞ্চনার শিকার হচ্ছে এই কথাগুলি তিনি সবসময় বলে বেড়াতেন এবং তার যে বক্তব্য ছিল ন্যাশনাল অ্যাসেম্বেলিতে সেখানেও তিনি এই বাঙালির অধিকারের কথাই তিনি সবসময় বলেছেন। আমরা বাঙালিরা আজকে স্বাধীন। অনেকেই হয়তো জানে না যে, আমরা কী অবস্থায় ছিলাম এবং কেন এই ‘আন্দোলন’ ভাষা আন্দোলন থেকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে জাতির পিতা এই বাঙালি জাতিকে নিয়েছিলেন। আমি একটু আপনাদের সামনে তুলে ধরি, সেটা ছিল সামরিক বা অসামরিক উভয় ক্ষেত্রে বাঙালি সবসময় বঞ্চিত ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারে যে সেক্রেটারি পদ ছিল মাত্র ৪টি সেখানে কোনো বাঙালি ছিল না। বাঙালি ছিল শূন্য। জয়েন্ট সেক্রেটারি ২২ জন তার মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ৮ জন। ডেপুটি সেক্রেটারি ৫৯ জনের থেকে মাত্র ২৩ জন পূর্ববঙ্গ থেকে। আর সেকশন অফিসার ৩২৫ জনের মধ্যে মাত্র ৫০ জন ছিল পূর্ববঙ্গ থেকে। সিনিয়র গেজেটেড পোস্ট বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এবং কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটে ৬৯২ জন পশ্চিম পাকিস্তানের আর পূর্ববঙ্গে ছিল মাত্র ৪ জন। শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশনে ১৬২ জন আর পূর্ববঙ্গ থেকে ৩ জন। রেডিও তখন রেডিও পাকিস্তান ছিল, ৯৮ জন পশ্চিম পাকিস্তানে আর পূর্ববঙ্গে মাত্র ১৪ জন। সাপ্লাই ডেভলপমেন্ট ১৬৪ জন আমরা মাত্র ১৫ জন। রেলওয়ে ১৫৮ জন বাঙালি মাত্র ১৪ জন। পোস্ট ও টেলিগ্রাফ ২৭৯ জন বাঙালি ৫০ জন। কৃষি অর্থনৈতিক কর্পোরেশন ৩৮ জন বাঙালিমাত্র ১০ জন এবং সার্ভে অফিসার ৬৪ জন বাঙালি মাত্র ২ জন। বিমান বা এয়ারলাইন্সে ১০২৫ জনের মধ্যে বাঙালিমাত্র ৭৫ জন। আর সামরিক ক্ষেত্রে অবস্থা তো আরও করুণ ছিল। কোনো বাঙালিকে তারা বিশ্বাস করত না। আর বাঙালিরা সেনা সদস্য হতে পারে, যুদ্ধ করতে পারে এটা তারা মনেই করত না। সেখানে অবস্থাতাটা কি ছিল? জেনারেল, পাকিস্তানি জেনারেল ছিল ৩ জন পূর্বেবঙ্গে শূন্য, কোনো বাঙালি ছিল না। মেজর জেনারেল ২০ জন পূর্বেবঙ্গ শূন্য। বিগ্রেডিয়ার ৩৪ জন পূর্বেবঙ্গ শূন্য। কর্নেল ৪৯ জন পূর্ববঙ্গ শূন্য। লেফটেন্ট কর্নেল ১৯৮ জন পূর্বেবঙ্গে মাত্র ২ জন। আর নৌবাহিনী অফিসার ৫৯৩ জন পূর্ববঙ্গে ৭ জন। বিমান বাহিনী ৬৪০ জন পূর্ববঙ্গ মাত্র ৪০। এই ছিল আমাদের অবস্থা। এই বঞ্চনার কথাগুলি প্রকাশ পায় ডন পত্রিকায় পাকিস্তানে। কাজেই এই বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি দেবার জন্য জাতির পিতা যে সংগ্রাম করেছিলেন তার প্রতিটি সংগ্রামের লক্ষ্যটাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাঙালি জাতি স্বাধীন হবে এবং স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা পাবে। আপনারা দেখবেন তার প্রতিটি পদক্ষেপ; ধীরে ধীরে তিনি কিন্তু সেইভাবে বাঙালিকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ৬-দফা তিনি যখন দিলেন ’৬৫ সালে যখন যুদ্ধ হলো আমরা কিন্তু অরক্ষিত ছিলাম। তারপরই তিনি ৬-দফা পেশ করলেন। গোলটেবিল বৈঠকে লাহোরে। সেখানে ৬-দফা দেবার পর স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানিরা এটা মেনে নিতে পারেনি। ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ৬-দফা দিলেন এবং ৮ই মে তাকে গ্রেফতার করা হলো। শুধু গ্রেফতার করাই না, একটার পর একটা মামলা।
এরপর ’৬৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গ্রেফতার করে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ক্যান্টনমেন্টে। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে ৩৫ জন আসামি, বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন আসামি তাদেরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হলো। কারণ ৬-দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির দফা। এই ৬-দফা আন্দোলন এত দ্রুত এভাবে যে ছড়িয়ে যাবে এবং বাঙালি গ্রহণ করতে এটা পাকিস্তানি শাসকরা কখনও ভাবতে পারেনি। ৭ই জুনের যে হরতাল হলো ১১ জন মানুষ সেখানে মারা গেল। তারা জীবন দিয়ে, তেজগাঁর মনুমিয়াসহ ১১ জন শ্রমিক নেতা জীবন দিয়েছিল। ’৬৯-এ জাতির পিতার মুক্তির দাবিতে সারা বাংলাদেশে আমরা আন্দোলন শুরু করি। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ’৬৯ সালে ৬-দফাসহ ১১-দফা নিয়ে ’৬৮ সাল থেকেই গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৬৯ সালে আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান। তার ফলে পাকিস্তানি শাসকরা বাধ্য হয়েছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে। বঙ্গবন্ধুসহ ৩৪ জনকে মুক্তি দিল। কারণ একজন সার্জেন্ট জহিরুল হক তাকে ওই বন্দী থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাটা ছিল একটা টেস্ট কেস। তারা চেয়েছিল এইভাবে বঙ্গবন্ধুকেও হত্যা করতে। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লে আপনারা এই বিষয়টা জানতে পারবেন।
তিনি কিন্তু বারবার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন ও আমাদেরকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছেন এবং স্বাধীনতার মশাল জ্বেলেছেন। তার ফলে ’৭০-এর নির্বাচনে যখন সমগ্র পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করল। বঙ্গবন্ধু জানতেন যে এই নির্বাচনে জয়লাভ করবেন, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা দেবে না, আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। এই যুদ্ধের প্রস্তুতিও তিনি নিয়ে রেখেছিলেন। তার একজন সাক্ষী আমি নিজে। ’৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তিনি যখন মুক্তি পেলেন, এরপর অক্টোবর মাসে ২৩শে অক্টোবর তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন। প্রবাসীরা ওই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আন্দোলন করেছে, স্যার টমাস উইলিয়াম কিউসি এমপিকে পাঠিয়েছিল। কাজেই তিনি সেই কৃতজ্ঞতা জানাতে আর সেই সাথে সাথে নির্বাচন আসবে এবং নির্বাচন পরবর্তী পাকিস্তানিরা যে ক্ষমতা দেবে না, তারপর আমাদের যে যুদ্ধ করতে হবে, দেশ স্বাধীন করতে হবে, তাহলে যুদ্ধ করতে গেলে আমাদের কী কী প্রয়োজন? আমাদের অস্ত্রের প্রয়োজন, আমাদের ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন, শরণার্থী গেলে তাদের সাহায্যের প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজন। তিনি লন্ডনে বসে সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করেছিলেন। সবকিছুর ব্যবস্থাই তিনি করে আসেন। কিন্তু তিনি মুখে সেটা বলেন নি।
’৭০-এর নির্বাচনে জয়ী হবার পর ঠিক একই ঘটনা ঘটল। তার ঐতিহাসিক সেই ৭ই মার্চের ভাষণ এবং অসহযোগ আন্দোলন; বিশ্বের ইতিহাসে আর কোনো নেতা এই ধরনের অসহযোগ আন্দোলন করতে পারেনি। কাজেই তিনি একদিকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন অপরদিকে সশস্ত্রযুদ্ধের ক্ষেত্রটাও প্রস্তুত করলেন। সেখানে কারা আক্রমণকারী হবে এটাই ছিল সব থেকে বড় কথা। ৭ই মার্চের ভাষণে কীভাবে গেরিলাযুদ্ধ হবে, কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে সব নির্দেশনা দিয়েছিলেন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার জন্য। আজকে সেই ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বে ইউনেস্কো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দুর্ভাগ্য যে, একসময় সেই ভাষণÑ এ দেশে ’৭৫-এর পর নিষিদ্ধ ছিল। সেই ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি সব নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এখানে তার যে কথাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘কেউ দাবায় রাখতে পারবা না’। ঠিকই বাঙালিকে কেউ দাবায় রাখতে পারেনি। যুদ্ধে আমরা বিজয় অর্জন করি। জাতির পিতা ২৫শে মার্চ, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা যখন ঘোষণা দিলেন, তারপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকার গঠন হয় এবং যুদ্ধ হয়, আমরা বিজয় অর্জন করি। আন্তর্জাতিক চাপে তখন তাকে মুক্তি দেয়। আমাদের এই সংগ্রামে সব থেকে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র। পৃথিবীর সমস্ত জনগণ। সেই সুদূর আমেরিকা থেকে শুরু করে সারাবিশ্বের সাধারণ মানুষ আমাদের পাশে ছিল এবং সমর্থন দিয়েছিল। এই বিশ্ব জনমতের চাপে বঙ্গবন্ধুকে তারা মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। তিনি ১০ই জানুয়ারি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। ১০ই জানুয়ারি ভাষণেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে সেই সমস্ত দিক-নির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন। ওই ভাষণের মধ্য দিয়েই আমরা সবকিছু পাই যে, কীভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে। মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি হাতে সময় পেয়েছিলেন। আর এই সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলা, এটা কিন্তু কোনো সহজ কাজ ছিল না।
মহান মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনী ভারতের হাজার হাজার সৈন্যরা জীবন দিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা যুদ্ধ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা যখন মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলেন তার সেনাবাহিনী ফেরত নিতে, তিনি কিন্তু তার সেনাবাহিনী ফেরত নিয়েছিলেন। সাধারণত বিশ্বে আমরা দেখি যে, এভাবে কখনও ফেরত নেয় না। পৃথিবীর কোনো দেশ থেকে কোনো মিত্রবাহিনী ফেরত যায়নি। একমাত্র বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। জাতির পিতার মতো নেতৃত্ব ছিল বলেই সেটা সম্ভব হয়। স্বাধীনতার পর ’৭২ সালের ১৬ই জুলাই তিনি একটি ভাষণে বলেছিলেনÑ ‘স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর, তা রক্ষা করা তার চেয়েও কষ্টকর। স্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য বহু সময়ের প্রয়োজন হয়।’ এই যে তিনি কথাগুলো বলেছিলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছিল। সেটাও জাতির পিতার বলিষ্ট নেতৃত্বের কারণেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। আমাদের জীবনে এলো ’৭৫-এর ১৫ই আগস্টের কালরাত। আপনারা জানেন যে, ৩২ নাম্বারের ওই বাড়ি, যে বাড়িটিকে আমি মিউজিয়াম করে দিয়েছি। উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা দুই বোন পেয়েছিলাম। যেহেতু ওই বাড়ি থেকে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছেন, আর ওই বাড়িতেই তিনি জীবন দিয়ে গেছেন। জনগণের নেতা তিনি ছিলেন। এই সম্পত্তিতে আমাদের দুই বোনের কোনো অধিকার নেই। আমরা জনগণের সম্পত্তি জনগণের হাতেই দিয়ে দিয়েছি। ট্রাস্ট করে দিয়েছি। আপনারা জানেন, সেখানে মিউজিয়াম। অবশ্যই আপনারা যারা সেখানে যাননি, নিশ্চয়ই আপনারা যাবেন আমি আশা করি।
আমরা যদি এইটুকু চিন্তা করি যে, মাত্র সাড়ে তিন বছরে তিনি এই দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ করলেন আর সেখানে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এরপর বাংলাদেশের অবস্থাটা কী ছিল? অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা। হত্যা-ক্যু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। আপনারা দেখেছেন কীভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। আমরা দেখেছি কীভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করা হয়েছে। জাতির পিতার নাম-নিশানা মুুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ৭ই মার্চের ভাষণ একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। ইতিহাসে তার কথা বলা যেত না। ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। একুশটা বছর এই অবস্থা বাংলাদেশে চলেছে। সত্যকে কেউ কখনও চাপা দিতে পারে না। আর জাতির পিতা তো বলেই গেছেনÑ ‘কেউ দাবায় রাখতে পারবা না’, ঠিকই তো দাবায় রাখতে পারেনি।
আপনারা ’৮১ সালে আওয়ামী লীগ আমার অবর্তমানে আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। আমি ফিরে এসেছিলাম মা-বাবা, ভাইÑ সব হারিয়ে। সেই হারাবার বেদনাকে সম্বল করে, সেই শোককে বুকে ধারণ করে ফিরে এসেছিলাম বাংলার মানুষের কাছে। যেই মাটি ও মানুষের জন্য আমার বাবা জীবন দিয়েছেন, আমিও চেষ্টা করব এই বাংলার মানুষের জন্য কিছু করতে। আমি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, যারা সেইদিন আমাকে নির্বাচিত করেছিলেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। কৃতজ্ঞতা জানাই যে, আজকে সাঁইত্রিশটা বছর এই দলের নেতৃত্বে; আমি তো বলেছিলাম যে, একজন কাউন্সিলরও যদি আপত্তি জানায় আমি আর সেইদিন এই দলের সভানেত্রী থাকব না, সভাপতি হব না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আমি পিতৃস্নেহ পেয়েছি। মাতৃস্নেহ পেয়েছি। ভাইয়ের ভালোবাসা পেয়েছি। বোনের ভালোবাসা পেয়েছি। আসলে আমার পরিবার হারিয়ে আওয়ামী লীগই হয়ে গেছে আমার পরিবার। আওয়ামী লীগই আমার আপনজন। আর এই আওয়ামী লীগকে নিয়ে সংগ্রাম করে করে ২১ বছর আমি সরকার গঠন করি। স্বাভাবিকভাবে আপনারা জানেন যে, আমি সবসময় চেষ্টা করেছি যে একদিন না-একদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসবেই। কিন্তু ক্ষমতায় আসলে আমরা কী করব, কীভাবে আমাদের এই দেশে জাতির পিতার যে আকাক্সক্ষা ছিল, যে স্বপ্ন ছিল তা বাস্তবায়ন করব। কীভাবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব, আমরা সেই প্রচেষ্টা চালিয়েছি। যার জন্যে আমি বিভিন্ন উপ-কমিটি করেছি, বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনার করেছি। আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে আমরা সময়োপযোগী করেছি। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে অবশ্যই আমাদেরকে সময়োপযোগী পরিবর্তন আনতে হবে। এটা পরিবর্তনশীল বিশ্ব। আমরা সেটা মাথায় রেখেই সেই পরিবর্তনগুলি নিয়ে এসেছি। সেই সাথে সাথে যখন আমরা সরকার গঠন করেছি, আসলে ওই সময় সত্যিকারভাবে বাংলাদেশের জনগণ প্রথম অনুভব করতে পারল যে, সরকার মানুষের সেবা করে। সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করে। এর পূর্বে কিন্তু এ দেশের মানুষ কখনও এটা উপলব্ধি করতে পারে নাই। কারণ ’৭৫-এর পর যারা এসেছে একের পর এক ক্ষমতায়। ক্ষমতা ছিল ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। তারা সাধারণ মানুষের কথা কী জানবে। কোত্থেকে জানবে। উড়ে এসে জুড়ে ক্ষমতায় বসে শুধু নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা। কীভাবে নিজেরা ভোগবিলাসে জীবনযাপন করবে, সেই ভোগবিলাসের দিকেই তাদের দৃষ্টি ছিল। তারা মেধাবী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র, মাদক তুলে দিয়েছে। তাদেরকে ব্যবহার করেছে। তারা দল ভাঙা-গড়ার খেলা খেলেছে। এলিট-শ্রেণি তৈরি করেছে। তাদের কারণে এ দেশে ঋণখেলাপি, দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। নিজেরাও দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। এভাবেই তারা মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। তাদের নীতিই ছিল যে, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে মজবুত করা যাবে না। বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যাবে না। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করা যাবে না। এগুলি আমার শুধু মুখের কথা না। এগুলির প্রামাণ্য দলিলও আছে। কাজেই যাদের চিন্তা-ভাবনা এই ধরনের ছিল তারা দেশের মানুষের কল্যাণে কীভাবে কাজ করবে।
জাতির পিতা আমাদের শিখিয়েছেন রাজনীতির লক্ষই হচ্ছে জনগণের কল্যাণ সাধন করা। এ রাজনীতি যদি জনগণের কল্যাণের জন্য না হয়, তাহলে সে রাজনীতির মধ্য দিয়ে মানুষের জন্য কোনো কিছু করা যায় না। মানুষকে কিছু দেওয়া যায় না। সবসময় আমাদের এই চিন্তাই করতে হবে যে, আমরা যারা রাজনীতি করি, এটা নিজেদের ভোগ দখলের জন্য না, ভোগবিলাসের জন্য না। মানুষকে কতটুকু দিতে পারলাম, মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, সেই চিন্তাটাই একজন রাজনীতির জীবনে সব থেকে বড় সম্পদ। সেই চিন্তাটাই আমাদের করতে হবে। কিন্তু আমি জানি যে, হয়তো অনেকেই সেটা চিন্তা করতে পারে না। কারণ এ দেশের রাজনীতিটাই হয়ে গিয়েছিল এমন যে, ভোগবিলাস একটা উচ্ছৃঙ্খলতা এবং সবকিছু সো-আপ করা। দেখানো। এই ধরনের একটা মানসিকতা নিয়েই মিলিটারি ডিক্টেটররা এই দেশ পরিচালনা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, আমরা সাধারণ মানুষ, একেবারে গরিব মানুষ, তাদের জন্য কাজ করেছি। তাদের কাছে আমরা চলে গেছি, কীভাবে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করা যায়। আমাদের নীতিমালা, আমাদের প্রতিটি পরিকল্পনা, এই পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি, একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে। আর সে কারণেই আজকে বাংলাদেশ ’৭৫-এর পর থেকে ২১ বছর যা করতে পারেনি। ’৭৫ পর্যন্ত জাতির পিতা ক্ষমতায় ছিলেন। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ ভাগ পর্যন্ত তিনি অর্জন করে দিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে। আর এরপর যদি আপনারা দেখেন, সেখানে মানুষের কল্যাণে কোনো কাজ হয় নাই। শুধুমাত্র ক্ষমতায় যারা কুক্ষিগত ছিল তাদেরই ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতার আশেপাশে যারা ছিল তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু জনগণের না। জনগণের জন্য তারা কাজ করেও নি। করতেও চায় নি। ভোগবিলাস, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মানুষ খুন আমরা দেখেছি। ১৯টা ক্যু হয়েছে এ দেশে। কত সামরিক অফিসার এবং সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের জীবন দিতে হয়েছে। অহেতুক তারা জীবন দিয়েছে। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছি এবং আমি বাংলাদেশে এসে প্রথম এই হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি। আমি জানি, এজন্য হয়তো অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। কিন্তু আমরা সবসময় এটাই চিন্তা করেছি যে, এই দেশে এই ধরনের অরাজকতা চলতে পারে না। এদেশ একটা সুন্দরভাবে দেশ চলতে হবে। কারণ রাজনীতি হচ্ছে দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। রাজনীতি হচ্ছে দেশ গড়ার জন্য। দেশ গড়াটাকে আমরা ধারণ করেছি এবং জনকল্যাণে আমরা কাজ করেছি।
আজকে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যার ফলে আজকে আমরা বহির্বিশ্বে আবার আমাদের সম্মান ফিরে পেয়েছি। নইলে একসময় বাংলাদেশ বললে কী বলা হতো, কেউ যদি শুনত বাংলাদেশ বলত, ওহ বাংলাদেশ মানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগÑ এই হলো বাংলাদেশ। আসলে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা সেভাবেই চিন্তা করত। কারণ ’৯৮ সালে যখন প্রথম বাংলাদেশকে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলাম তখন পার্লামেন্টে বিএনপি নেত্রী এবং তাদের অর্থমন্ত্রী তারা বলল, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ভালো না। কারণ বিদেশ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে না। ভিক্ষা পাওয়া যাবে না। এই ছিল তাদের মানসিকতা। এই ছিল তাদের নীতিমালা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটা না। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম যে, ‘আমরা ভিক্ষা করে চলতে চাই না।’ জাতির পিতা বলেছেন, ‘আমার মানুষ আছে, মাটি আছে, এই দেশকে গড়ে তুলব।’ আমরা সেই নীতিতে বিশ্বাস করি। আমি আরও তাদেরকে বলেছিলাম যে, ক্ষুধার্থ মানুষের কঙ্কালসার দেহ দেখিয়ে আপনারা ভিক্ষা করে এনে নিজেদের উদরপূর্তি করবেন আর নিজেদের ঘাড়ে-গোতরে মাংস হবে আর দেশের মানুষ না খেয়ে মরবেÑ আমরা সেটা হতে দেব না। আমরা দেশের মানুষের কল্যাণেই রাজনীতি করি, কল্যাণেই রাজনীতি করব। রাজনীতিটা আমাদের সেই চিন্তা থেকেই হওয়া উচিত। সেটাই আমরা করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য আমরা এ দেশকে আরও উন্নত করব।
আমরা যখন ২০০৮-এ নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিলাম আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম, দিনবদলের সনদ। ২০০৮ থেকে আজকে ২০১৮। ২০০৯-এ আমরা সরকার গঠন করেছি। আজকে ৯ বছর পূর্ণ করেছি। আজকের বাংলাদেশ মাত্র ৯ বছরের মধ্যে সত্যিকার অর্থে আজকে আমরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। এখন আমরা স্বল্পন্নোত দেশ নয়, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছি। অর্থাৎ রাজনীতি যদি সঠিক হয় আর দেশের কল্যাণ চিন্তা করা যায়, তাহলে অবশ্যই উন্নয়ন করা সম্ভব। এটা আমরা প্রমাণ করেছি। আজ আমাদের বাজেট প্রায় ৪-৫ গুণ বৃদ্ধি করেছি। উন্নয়ন প্রকল্প আমরা বৃদ্ধি করেছি। আমাদের সবকিছু তৃণমূলকে ঘিরে। বাংলাদেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেব আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল। ’৯৬ সালে মাত্র ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। যেটুকু বৃদ্ধি করেছিলাম তাও বিএনপি এসে বন্ধ করেছিল। বিএনপি যখন ২০০১-এ ক্ষমতায় আসে, তখন ক্ষমতায় এসে তারা কী করেছে? তারা তো মানুষ খুন করা ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। তারা আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অত্যাচার করেছে, নির্যাতন করেছে। ছোট শিশু সেই রাজুফা থেকে শুরু করে মেয়েদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করেছে।
আওয়ামী লীগ জনগণের সেবায় কাজ করেছে। আমরা কখনও প্রতিশোধপ্রবণ হইনি। আমরা চেয়েছি দেশের উন্নয়ন। আর সেই দেশের উন্নয়নের জন্যই আজকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা জানেন যে, এটা জুন মাস। আমাদের বাজেট সেশন চলছে। সেই ঐতিহাসিক ৭ই জুনেই কিন্তু এবার আমরা ঐতিহাসিক বাজেট দিয়েছি। আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে বাজেট দিয়েছেন। এবার ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট আমরা দিতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু একটু পেছনে ফেরেন, বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তাদের যে শেষ বাজেট তারা দিয়েছিল ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সেই বাজেট কত ছিল? মাত্র ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকার বাজেট ছিল। মাত্র ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকার বাজেটকে আজকে আমরা ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। তাদের উন্নয়ন বাজেট ছিল, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা মাত্র ১৯ হাজার কোটি টাকা। আর এখন আমরা প্রায় ১ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে উন্নয়ন বাজেট দিতে সক্ষম হয়েছি। সেটা দেবার মতো আর্থ-সামাজিক উন্নতি বাংলাদেশে ঘটেছে। জাতির পিতা যে প্রবৃদ্ধি উন্নীত করেছিলেন, এরপর আর ২১ বছরে কখনও বাড়েনি। সেটা কমে ছিল। আজকে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭.৭ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। মাথাপিছু আয় আমরা বৃদ্ধি করেছি।
প্রত্যেকটা সূচকে আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, বিদেশে যখন আমরা যাই তারা বলেন যে আপনারা ১৬ কোটি মানুষের দেশ, ৫৪ হাজার বর্গমাইলে ১৬ কোটি মানুষের বাস, সেখানে কীভাবে আপনারা অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারেন? আমার জবাব শুধু একটাই যে, মানুষই তো আমাদের শক্তি। এই মানুষই আমাদের মূল শক্তি। আর যদি আন্তরিকতা থাকে, যদি নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করা যায়, তাহলে যে কোনো অসাধ্য সাধন করা যেতে পারে।
নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছি বলেই, আর সুষ্ঠু পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি, আমরা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা জাতির পিতা যেভাবে শুরু করেছিলেন, তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা আমরা প্রণয়ন করেছি, বাস্তবায়ন করেছি। যেমন পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী আমাদের করা, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করে সেটাও কার্যকর করেছি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাও আমরা এখন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আমাদের হাতে সময় কম। ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। এই সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে হলে আমরা চাইÑ এই বাংলাদেশ যেন উন্নত হয়। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা পালন করব। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা যেন এটুকু বলতে পারি যে আজকে বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্র্যমুক্ত। সেই লক্ষ নিয়েই আমরা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। ২০১০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত আমরা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়িত করেছি বলেই আজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এখন আর বিদেশের কাছে আমাদের হাত পাততে হয় না। আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৯০ ভাগ ব্যয় করি নিজস্ব অর্থায়নে। কারও কাছে ভিক্ষা চাইতে হয় না। আপনারা জানেন, ওই পদ্মাসেতু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং দোষারোপ করতে চেয়েছিল। একজন সুদখোরের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে আমেরিকান তদানীন্তন যিনি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারই নির্দেশে এই পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দেন। এই ডড়ৎষফ ইধহশ আমাদেরকে দোষারোপ করতে চেয়েছিল দুর্নীতির। আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম যে, দুর্নীতি করে নিজের ভাগ্য গড়তে ক্ষমতায় আসি নাই। জনগণের ভাগ্য গড়তে এসেছি। কাজেই আমি চ্যালেঞ্জ দিছি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরÑ আমি, আমার ছোট বোন রেহানা, আমাদের ছেলেমেয়ে, প্রত্যেকেরই দেশে-বিদেশে কী সম্পত্তি সেগুলো নিয়ে অনেক তদন্ত তারা করেছে, কিছুই পাইনি। ওই তদন্ত করতে যেয়ে বিএনপি নেত্রীর ছেলেদের দুর্নীতির তথ্য বের হয়ে এসেছে। তার নিজের দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এরপর যখন ডড়ৎষফ ইধহশ করতে গেল, আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম যে কী দুর্নীতি হয়েছে আমাকে প্রমাণ দেন। ওই দুর্নীতির প্রমাণ দিতে যেয়ে বেরোল, আমাকে যে কাগজগুলো দেখাল, বিএনপি মন্ত্রীর দুর্নীতির তথ্য। আমি দেখালাম যে এটা আমার সরকার না, এটা খালেদা জিয়ার সরকারের মন্ত্রীর দুর্নীতি। এটা আমার সরকার না। আমরা এখানে দুর্নীতি করতে আসিনি। প্রমাণ করতে হবে।
আমি ঘোষণা দিলাম যে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু আমরা নির্মাণ করব। ডড়ৎষফ ইধহশ-এর টাকা দিয়ে আমরা করব না। অনেক বাধা, অনেক কিছু ছিল। কিন্তু আমি সাহস পাই, শুধু আমার বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভরসা করি আর আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ওপর। অনেকে অনেক পরামর্শ দিয়েছে। অনেকেই বলেছে এটা সম্ভব না, ডড়ৎষফ ইধহশ ছাড়া হবেই না। আমি বললাম, ডড়ৎষফ ইধহশ দিয়ে যদি করতে হয় পদ্মাসেতু করব না। কেউ কেউ বলেছে, পদ্মাসেতু করবেন না আপনি বলেছেন, তাহলে আপনার সিট। আমি বলেছি, আমি জনগণের কাছে যাব, আমি ব্যাখ্যা দিয়ে বলব। জনগণ নিশ্চয়ই বুজবে। এখানে সততার প্রশ্ন, সেখানে কোনোমতেই আমি তাদের কাছে নত হতে পারি না। আমার নত হওয়া মানে আমার দেশকে নত করা। আপনারা জানেন যে, অবশেষে কানাডার কোর্ট কিন্তু রায় দিতে বাধ্য হয়েছে যে ডড়ৎষফ ইধহশ ব্যাংকের সমস্ত অভিযোগ ছিল ভুয়া। সমস্ত অভিযোগ ছিল মিথ্যা। তারা কিছু প্রমাণ করতে পারে নাই। কোনো দুর্নীতি আমরা করতে আসি নাই। আজকে সেই পদ্মাসেতু আমরা নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করে যাচ্ছি। আপনারা দোয়া করবেন, যেন ভালোভাবে এই সেতু নির্মাণকাজ যেন সমাপ্ত করতে পারি। সেই জন্য সকলের কাছে দোয়াও চাই, সহযোগিতাও চাই।
আমরা এই দেশের প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের উন্নয়নের জন্য আমরা ব্যাপক কাজ করেছি। আমি আপনাদেরকে অনুরোধ করব যে, মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে বাজেট বক্তৃতা দিয়েছেন সেখানে আমাদের উন্নয়নের পুরো ফিরিস্তিটা দেওয়া আছে। আবার মহামান্য রাষ্ট্রপতি যে ভাষণটা দিয়েছেন সেখানেও দেওয়া আছে। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীর সেগুলি পড়া উচিত, জানা উচিত এবং মানুষের কাছে বলা উচিত। কারণ খালি উন্নয়ন করে ছেড়ে দিলেই হবে না, উন্নয়ন করার সাথে সাথে জনগণকে জানাতে হবে। আজকে আমরা বিনা পয়সায় বই দিচ্ছি। আমরা প্রায় ২ কোটি ৩ লক্ষ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি-উপবৃত্তি দিচ্ছি। ১ কোটি ৩০ লক্ষ মায়ের নামে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা পাঠাচ্ছি। মা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা পেয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমরা শিক্ষকদের প্রমোশন, শিক্ষকদের উন্নতি এবং ১২৩ ভাগ বেতন আমরা বাড়িয়েছি। জাতির পিতা ৩৬ হাজার স্কুল জাতীয়করণ করেছিলেন। আমরা সরকারে এসে এর পরই প্রথম ২৬ হাজার স্কুল জাতীয়করণ করে দিয়েছি। প্রত্যেক উপজেলায় আমরা একটি করে সরকারি স্কুল-কলেজ করে দিচ্ছি বা সরকারিকরণ করে দিচ্ছি। আমরা শিক্ষা যাতে মানুষের দৌরগোড়ায় পৌঁছায়। আমাদের দেশের একটা মানুষও যেন অশিক্ষিত না থাকে। সে নিরক্ষর না থাকে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা সমস্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। যার ফলে আজকে আমাদের সাক্ষরতার হার ৭৩ ভাগ বেড়েছে। দুর্ভাগ্য হলো ’৯৬ সালে সরকারে এসে আমরা ৪৫ ভাগ থেকে ৬৫.৫ ভাগে উন্নীত করেছিলাম। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তা কমিয়ে আবার ৪৪ ভাগে নিয়ে এসেছিল। সেই ৪৪ ভাগ থেকে আজকে ৯ বছরে আমরা ৭৩ ভাগে বৃদ্ধি করতে পেরেছি। ইনশাল্লাহ হয়তো আরও বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা থেকে শুরু করে সবকিছু আমরা দিয়ে যাচ্ছি। আজকে মোবাইল ফোন জনগণের হাতে হাতে। ‘ফোর-জি’ চালু করেছি।
আজকে বাংলাদেশে আমাদের যে সমস্যাগুলি ছিলÑ ভারতের সাথে গঙ্গা পানি চুক্তি করেছি। আমাদের স্থল সীমানা চুক্তি জাতির পিতা করে গিয়েছিলেন, আইন করে গিয়েছিলেন। স্থল সীমানা চুক্তি করে তিনি সেই আইনও করে যান। কিন্তু ’৭৫-এর পরে যারা ক্ষমতায় এসেছে, যতই ভারত-বিরোধী কথা বলুক, ভারতের কাছে যেয়ে এই দাবি কখনোই করার সাহসই পাইনি, করেও নাই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, আমি প্রথমবার এসেই শুরু করি যে কীভাবে আমাদের খধহফ ইড়ঁহফধৎু অর্থাৎ আমাদের স্থল সীমানা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। তারই ধারাবাহিকতায়, এবার আপনারা জানেন যে ভারতের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে তারা বিল পাস করে এই স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন করে দিয়েছে। সেজন্য তাদের সকল দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। আমাদের সমুদ্রসীমা, জাতির পিতা এই সমুদ্রসীমা আইন করে যান ’৭৪ সালে। কিন্তু এরপর সমুদ্রসীমায় আমাদের যে অধিকার আছে, সেই কথাটা কখনও জিয়া সরকার বলেনি। এরশাদ সরকার বলেনি। খালেদা জিয়া সরকারÑ কেউ কোনোদিন বলে নাই বা এটার সমাধানের কোনো উদ্যোগই নেই নাই। আমি সরকারে আসার সাথে সাথে প্রথমবার থেকেই উদ্যোগ নেই এবং আমরা সইও করে আসি। আমাদের কেবিনেটেও আমরা পাস করি। এই সমুদ্রসীমা বাস্তবায়ন করতে হবে, আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের দুটি প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমান ও ভারত, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেও আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে আমরা জয়ী হই। সমুদ্রসীমায় বিশাল অর্জন আমরা করতে পেরেছি। আমরা একদিকে যেমন জাতির পিতা, আমাদের যে পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে গেছেন ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।’ সেই পররাষ্ট্রনীতি আমরা যেভাবে মেনেছি, পাশাপাশি সমস্যাগুলিও আমরা একে একে সমাধান করেছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি করেছি। আমাদের ৬৪ হাজার শরণার্থী ছিল ভারতে, তাদেরকে আমি ফিরিয়ে এনে এই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছি। প্রতিনিয়ত যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল, আমরা তা বন্ধ করেছিলাম এই শান্তিচুক্তি করে।
জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতাদখল করে কি করেছে? একদিকে সেনাপ্রধান আরেকদিকে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা। সেই আইয়ুব খানের পদাঙ্ক অনুসরণ। তারপর দল গঠন। অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারীর হাতে গঠিত দল জনগণকে কী দিতে পারবে? চুরি করতে পারে। এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে আজকে তাদের নেত্রী জেলে। আবার জেলে যাওয়াতে এমন একজনকে তারা চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করল, যে দুই-দুটা মামলায় একটা সাত বছর, আরেকটা ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। সে হয়ে গেল বিএনপির চেয়ারপারসন। এমনকি বিএনপি তার গঠনতন্ত্রÑ তাদের গঠনতন্ত্রে ছিল যে কেউ যদি এই ধরনের দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত হয়, সে কখনও চেয়ারপারসন হতে পারবে না। তারা আবার তাদের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে, তারা দুর্নীতিবাজদের যেন রাখতে পারেÑ সেটাই তারা প্রমাণ করল। নিজেরাই শিকার করল যে তাদের দলটাও দুর্নীতির দল। এই ধরনের দল ক্ষমতায় থেকে দেশের সমস্যার সমাধান করা, এটা তো তারা করতে পারে নাই। এটাই প্রমাণিত সত্য। জনগণের কাছে এই কথাগুলি আপনাদের জানাতে হবে যে, দুর্নীতিকেই তারা এখন তাদের গঠনতন্ত্রে নিয়ে এসে, সেটাকেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। তাদের নীতিটাই হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি, মানুষ খুন, হত্যা, সন্ত্রাস, মাদকই হচ্ছে তাদের চরিত্র। সে কারণে তারা দেশের কখনও কল্যাণ করতে পারেনি। দেশের উন্নতি করতে পারেনি। কীভাবে মানুষ হত্যা তারা করেছে! ২০১৫ সালের কথা একবার চিন্তা করেন, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা! ২০১৪ সালে নির্বাচন ঠেকানোর নামে মানুষের ওপরে যে জুলুম-অত্যাচার তারা করেছে, মানুষকে কীভাবে হত্যা করেছে!
আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি। ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছিলাম ’৯৬ সালে, ৪৩০০ উন্নীত করেছিলাম। বিএনপি আসলো ক্ষমতায়, সেটা কমিয়ে ৩২০০-তে নামিয়ে আনলো। মানুষ পেল কি? খাম্বা পেল। ওই রাস্তার পাশে খালি খাম্বা শুয়ে আছে। কারণ কী? খাম্বাই কিনেছে, বিদ্যুৎ আর উৎপাদন করে নাই। খাম্বা কোম্পানি খুলেছিল খালেদা জিয়ার ছেলে সেই কারণে। সেখান থেকে হাজার হাজার কোটি মেরে তারা খেয়েছে। আমরা আবার যখন ক্ষমতায় আসলাম ৩২০০ মেগাওয়াট থেকে আজকে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৮০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করেছি। ১৮০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষমতা অর্জন করেছি এবং ৯৩ ভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিচ্ছি। সেই সাথে আমরা এখন গ্রিডলাইন নির্মাণ করে, সঞ্চালনলাইন নির্মাণ করে বিদ্যুৎ যেন সেখানে পৌঁছায়, তার ব্যবস্থা করেছি। যেখানে গ্রিডলাইন নাই, সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বা বায়োগ্যাসের মাধ্যমে আমরা বিদ্যুৎ দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট হচ্ছে। আমাদের দেশের চাহিদা যখন বাড়ছে, সেই চাহিদা অনুযায়ী আমরা যেন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। ইতিমধ্যে অনেকগুলি উপজেলা আমরা সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুতায়িত করেছি। আমি যখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলছিলাম, তখন এক বোন আমাকে বললেন যে আপা বিদ্যুৎ এসে গেছে, আমি এখন রাইস কুকারে ভাত রান্ধি। আজকে আমার গ্রামের মানুষ তারা রাইস কুকারে ভাত রাঁধে। ভ্যানে চললাম, দেখি ব্যাটারিচালিত ভ্যান, চার্জ দেয় এবং সেই ব্যাটারি দিয়ে তারা ভ্যান চালায় এখন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ভ্যানওয়ালাকেÑ যে কত বিদ্যুৎ খরচ হয়। কই বেশি হয় না আপা, মাত্র ৭০ ওয়াট হয়। তাহলে এটুকু তারা জানে।
আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়েছিলাম। এটা এখন বাস্তব। আজকে সারা বাংলাদেশে আমরা ইন্টারনেট সার্ভিস করে দিয়েছি। ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছি। মানুষ এখন সেবা পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে মহাকাশে পৌঁছে গেছি। আজকে মহাকাশ পর্যন্ত, সেই সমুদ্র তলদেশ থেকে নিয়ে মহাকাশ পর্যন্ত আমরা পৌঁছে গেছি। মাত্র ৯ বছর আমরা হাতে সময় পেয়েছি। এই ৯ বছরের মধ্যে এই অর্জন আমরা করতে সক্ষম হয়েছি। দারিদ্র্য বিমোচন আমাদের সব থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আমরা দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে চাই। আমাদের নেতা-কর্মীদের কাছে আমার কতগুলি অনুরোধ থাকবে। আমরা বয়স্ক ভাতা দিচ্ছি, বিধবা ভাতা দিচ্ছি। বিভিন্নভাবে প্রায় ১৪২ রকম সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। সঠিক মানুষের হাতে যেন এটা পৌঁছায় সেটা আমাদের দেখতে হবে। প্রতিটি মানুষ যেন গৃহ পায়। আশ্রয়ণ প্রকল্প, গৃহায়ন তহবিল থেকে ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচি’ এবং জাতির পিতার করে যাওয়া গুচ্ছগ্রাম, আদর্শগ্রাম-এর মাধ্যমে আমরা গৃহহীনদের গৃহ দিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার একটা চমৎকার উদ্যোগ নিয়েছিলেন আমাদের প্রশাসনের কর্মকর্তারা, পুলিশ কর্মকর্তারা। আমি যখন তাদের বেতন বাড়ালাম ১২৩ শতাংশ। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন তাদেরও কিছু করা উচিত। তারা নিজেরা একদিনের বেতন দিয়ে একটা ফান্ড তৈরি করল। এটা খুলনার জেলা প্রশাসক শুরু করেছিল। একদিনের বেতন দিয়ে ফান্ড তৈরি করে তারা ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন শুরু করেছে। আমি বললামÑ আপনারা যখন এটা শুরু করেছেন, সেখানেও আমি প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আপনাদের সহযোগিতা করব। কাজেই যারা এ ধরনের তহবিল গঠন করবেন, আমি সেই পরিমাণ টাকা দেব। প্রয়োজনে আরও বেশি দেব। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো মানুষ ভিক্ষা করবে না। কারণ জাতির পিতা সকলকে বলে গিয়েছিলেন, এই কথাটা সকলকে স্মরণ করতে হবে ‘ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না’। কাজেই বাংলাদেশের জনগণ আর ভিক্ষুক জাতি থাকবে না। আন্তর্জাতিকভাবেও যেমন আমরা নিজেদের অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প করতে পারি। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো মানুষ যেন রাস্তায় ভিক্ষা না করে তার জন্যে সবধরনের সহযোগিতা আমরা করে যাচ্ছি। এক একটা জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত হিসাবে ঘোষণা দেওয়া। যারা একেবারে কাজ করতে পারে না, তাদের জন্য আমরা ভিজিটিং কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যসাহায্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের যারা প্রতিবন্ধী তাদেরকে আমরা আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছি। ভাতা দিয়ে চাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। সেই সাথে আমরা ভিক্ষুকমুক্ত করতে চাই।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক করে দিয়েছি। যে কোনো যুবক বিনা জামানতে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারে। কাজেই এখানে শুধু চাকরির পেছনে ছোটা না, নিজেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এই যুবক-শ্রেণি নিজেরাই ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে, সেই সুযোগ রয়েছে। আমরা আমাদের পরিকল্পনায় গ্রামে যত বেশি পারি আমরা অর্থ দিচ্ছি। গ্রামে অর্থ দিয়ে অর্থনীতিকে আমরা শক্তিশালী করতে চাচ্ছি। যেন গ্রামের মানুষ একেবারে নিম্নবিত্ত থেকে যাতে আস্তে আস্তে উঠে আসতে পারে। ইতিমধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। আমরা এ কাজ আরও করে যাচ্ছি। একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও আমরা করেছি। অপরদিকে তারা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সে ব্যবস্থা করেছি। ঘরবাড়ি বিক্রি করে, বন্ধক রেখে মানুষ প্রবাসে যেত। আমরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক করে দিয়েছি এবং ডাটা এন্ট্রি করে দিচ্ছি। যারা বিদেশে যেতে চায়, প্রায় ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার আমরা করেছি। এই ৫ হাজার ২৭৫টি সেন্টারের মাধ্যমে যে কেউ বিদেশে যেতে চাইলে তারা রেজিস্ট্রেশন করতে পারে। সেখান থেকে চাহিদামাফিক আমরা বিদেশে পাঠাতে পারি। কোনো ঘরবাড়ি বিক্রি করতে হবে না। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে বিনা জামানতেও তাদেরকে ঋণ দেওয়া হয়। যেন তারা কাজ করে সেই টাকা শোধ দিতে পারে। ঘরবাড়ি আর যেন না বেঁচে বা বন্ধক না রাখে। শুধু তাই না, যারা বিদেশে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের চাকরি পাচ্ছেÑ সেই চাকরির নিশ্চয়তা আছে কি না। মেয়েরা যারা যাচ্ছে, যারা রেজিস্ট্রেশন করে যায়, তাদেরকে সিমকার্ড দিয়ে দেওয়া হয়। স্মার্টকার্ড দেওয়া হয়। তারা কোথায় চাকরি করে, না করে সেটা খোঁজ নেওয়া হয় এবং কোনো অসুবিধায় পড়লে তারা যেন যোগাযোগ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও আমরা করে দিয়েছি, মানুষের দুর্ভোগটা না হয়।
ইতিমধ্যে এক বছরে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ আমরা পাঠাতে সক্ষম হয়েছি প্রবাসে। কিন্তু কিছু কিছু লোক আছে, আমাদের মহিলারা আছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে অতি লোভে বিদেশে যেয়ে তারা বিপদে পড়ে। আপনারা তৃণমূল থেকে এসেছেন, নিশ্চয়ই আপনারা দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করবেন। সজাগ করবেন। এইভাবে দালালদের খপ্পরে পড়ে যেন তারা প্রবাসে না যায়। তারা যদি সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যায়, অন্তত তারা তাদের চাকরির নিশ্চয়তা, তাদের বেতনের নিশ্চয়তা, থাকার নিশ্চয়তা এবং অসুবিধা হলে তাদেরকে ফেরত আনতে পারি, সে ব্যবস্থা আমরা করতে পারি। আরেকটি বিষয় আপনাদের লক্ষ্য রাখতে হবেÑ এই বাংলাদেশই নয়, সারাবিশ্বব্যাপী আজকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস একটা সমস্যা। আর এই জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসের যারা হোতা আপনারা জানেন, অবৈধভাবে যারা অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এ দেশকে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদে নিয়ে গেছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ৫০০ জায়গায় বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা করে আমাদের কিবরিয়া সাহেব এমপি, সংসদ সদস্য ছিলেন আর আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপি এবং সংসদ সদস্য তাদেরকে কী নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাদেরকে হত্যা-চেষ্টা করা হলো। ২২ জন নেতাকর্মীকে আমরা হারিয়েছি আইভি রহমানসহ। সারা বাংলাদেশে কত মানুষকে তারা হত্যা করেছে, প্রকাশ্যে সেই বাংলাভায়েরা মিছিল করেছে অস্ত্র হাতে নিয়ে। পুলিশ পাহারা দিয়েছে তাদেরকে, উৎসাহিত করা হয়েছে। ৫০০ জায়গায় বোমা হামলা। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। আর মাদক তো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
আজকে আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এই বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের স্থান হবে না। সেই সাথে সাথে মাদকেরও স্থান হবে না। এই মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমরা বলব যে, আপনারা অবশ্যই এ ব্যাপারে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেবেন। এক একটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায় এই মাদকের জন্য। এক একটা পরিবারের দুঃখ এবং কান্না আমি দেখেছি। কাজেই এর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
আমরা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য আরেকটি কর্মসূচি নিয়েছি যে, বাংলাদেশে ১ ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। সেটা মাথায় রেখে প্রতিটি বাড়ি যেন খামারে পরিণত হয়। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প আমরা নিয়েছি। কারণ ক্ষুদ্র ঋণের সেই উচ্চ সুদ দিতে হয়, অনেকে এলাকা ছেড়ে পালায়, নয় আত্মহত্যা করে, না-হয় সন্তান বিক্রি করে দেয়। সেজন্য ক্ষুদ্র ঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র সঞ্চয় অর্থাৎ, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে আমরা ট্রেনিং দিচ্ছি, তাদেরকে ঋণ দিচ্ছি। তারা যে কাজ করতে চায় সেই কাজ করবে। সেই কাজের মধ্য দিয়ে কেউ যদি ১০০ টাকা জমাতে পারে, সরকারের পক্ষ থেকে আর ১০০ টাকা দিয়ে তার একটি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দুই বছর আমরা এই টাকা দেব। দুই বছর পর যে মূলধন হবে, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক করে দিয়েছি, সেই ব্যাংকে সে মূলধন থাকবে। সেখান থেকে সে তার নিজের ব্যবসা নিজে চালাতে পারবে। প্রকল্পের ওপর আর তাকে নির্ভরশীল হতে হবে না। সেটা মাথায় রেখেই আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছি। দারিদ্র্যের হাত থেকে তারা উঠে আসতে পারবে। সেখানে আরেকটু কাজ আমি করতে চাচ্ছি। যেহেতু কো-অপারেটিভের মাধ্যমে যেন তারা উৎপাদনমুখী হয়; সেই কো-অপারেটিভে যারা অনংবহঃ ডড়হবৎ, যার জমি আছে কিন্তু বিদেশে চাকরি করেন, তারাও যেন সদস্য হতে পারে এবং সেখানে একটা নীতিমালা ইতিমধ্যে করবার জন্য আমি নির্দেশ দিয়েছি। সেটা হলো যারা শ্রম দেবে এবং উৎপাদন করবে, সে উৎপাদনের একটা অংশ যারা শ্রম দেবে তাদের থাকবে। যারা জমির মালিক তাদের একটা অংশ থাকবে। আর কো-অপারেটিভের একটা অংশ থাকবে। যাতে কো-অপারেটিভ পরিচালনা ও উৎপাদিত পণ্যটা বাজারজাত করবার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার জন্য একটা নীতিমালা প্রণয়ন করার নির্দেশ ইতিমধ্যে আমরা দিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, সারা বাংলাদেশে যদি এটা করতে পারি ভালোভাবে-সফলভাবে, তাহলে কোনো মানুষ আর দরিদ্র থাকবে না। দারিদ্র্যের হাত থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারবে।
ইতিমধ্যে দারিদ্র্যের হার, যা বিএনপির আমলে ছিল ৪০ ভাগ, আজকে তা আমরা ২২ ভাগে নামিয়ে এনেছি। আমাদের লক্ষ্য যে, আমরা যদি আরও কমিয়ে এনে এটা ১৫/১৬-তে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমরা বলতে পারব বাংলাদেশ সম্পূর্ণ দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা পালন করতে চাই, এই দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতেও আমরা সেই ঘোষণা দিতে চাই যে, বাংলাদেশ এখন দারিদ্র্যমুক্ত। সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি, আমাদের নেতা-কর্মীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এই প্রকল্পগুলি, এই কাজগুলি যেন সুষ্ঠুভাবে হয়, সেখানে আপনাদেরও সহযোগিতা লাগবে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াÑ এগুলি জাতির পিতারই আকাক্সক্ষা ছিল এবং প্রত্যেক ইউনিয়নে ১০ বেডের হাসপাতাল তৈরির কাজ ওই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেই তিনি শুরু করেছিলেন। আমাদের এখন জনসংখ্যা বেড়ে গেছে, তাই আমরা কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিক, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রায় ১৮ হাজার ক্লিনিক থেকে ৩০ প্রকারের ঔষধ বিনামূল্যে আমরা মানুষকে দিচ্ছি। চিকিৎসাসেবাটা রেফারেল সিস্টেম করে দিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাটা নেবে। আর সেখানে থেকে যখন জটিল অবস্থা হবে, উপজেলা হাসপাতালে যাবে। উপজেলা হাসপাতাল থেকে জেলা হাসপাতাল বা বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাবে। প্রত্যেক উপজেলা হাসপাতালে ওয়েবক্যামেরা দেওয়া আছে। বিশেষায়িত ডাক্তারের পরামর্শ যাতে তারা নিতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিয়েছি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যাতে চিকিৎসাসেবা পেতে পারে, সেই সুযোগটাও আমরা সৃষ্টি করে দিয়েছি। আমরা এইভাবে চিকিৎসাসেবাটা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি। আপনাদের এলাকায়, বিশেষ করে আমাদের সংসদ সদস্যরা আছেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আছেন, আপনাদের এলাকায় যে সমস্ত কমিউনিটি ক্লিনিকÑ এই ক্লিনিকগুলি যাতে সঠিকভাবে চলে। কারণ স্থানীয় জনগণ জায়গা দিচ্ছে, আমরা ব্লিডিং করে দিচ্ছি, ওষুধ দিচ্ছি, যে যা পারেন সহযোগিতা করবেন। আপনারা যেহেতু রাজনীতি করেন, আমাদের সংবিধানে আছেÑ স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। যেটা জাতির পিতা করতে চেয়েছিলেন। কাজেই আপনারা আপনাদের এলাকায় সেখানে যেয়ে, সঠিকভাবে তারা চিকিৎসা পায় কি না, তাদের সেখানে কোনো অসুবিধা আছে কি না খোঁজ নেওয়া। আর অনেকেই বিত্তশালী আছেন, সম্পদশালী আছেন, সেখানে কী কী সহযোগিতা দেওয়া যেতে পারে, সে সহযোগিতাটুকু দেওয়া। আমাদের এই গৃহীত পদক্ষেপগুলিকে প্রকল্প হিসেবে দেখলে হবে না, সরকারি কাজ হিসেবে দেখলে হবে না। এটা জনগণের কল্যাণের কাজ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে সেইভাবেই নিতে হবে। এটা হচ্ছে জনগণের কল্যাণেই আমরা করছি। জনগণ যেন সেই সেবাটা পায়। সাথে সাথে আমি আরেকটা কথা বলব, আমরা যে কাজগুলি করেছি সেটা তো বলতেও হবে। কারণ ভোটের রাজনীতি করতে গেলে মানুষকে তো বলতে হবেÑ আপনাদের জন্য এই কাজ আমি করেছি। এই কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক আমি প্রথমবার যখন করি, খালেদা জিয়া ২০০১-এ এসে সেটা বন্ধ করে দিয়েছে। সেটা বন্ধ করে দিয়েছিল, আমরা এসে আবার শুরু করেছি। ওরা ক্ষমতায় আসা মানেই জনগণের দুর্ভোগ। কাজেই জনগণের কাছে এই কথাগুলি আপনাদের পৌঁছে দিতে হবে। যেন তারা এইটুকু বুঝতে পারে যে আমরা কীভাবে কাজ করেছি।
আমরা প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানেরই উন্নয়ন করেছি। আমাদের সেনাবাহিনী বলেন, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বিজিপি, আনসার, ভিডিপিÑ প্রত্যেকের কল্যাণেই আমরা ব্যাপক কাজ করেছি। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্তের প্রতীক, সেসকল প্রতিষ্ঠান, সেগুলিকে সেভাবেই আমরা গড়ে তুলছি। একটা স্বাধীন দেশ, সার্বভৌম দেশ। আমরা যুদ্ধ চাই না; কিন্তু কেউ আমাদের আক্রমণ করলে যেন আমরা মোকাবেলা করতে পারি, সেই রকম প্রস্তুতি অবশ্যই আমাদের থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলাÑ মানুষ যেন সেবা পায় সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলির আরও উন্নয়ন করে দিচ্ছি। সংখ্যা বাড়িয়েছি। পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়েছি। সেভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
বলতে গেলে প্রায় প্রতিজেলায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আমরা তৈরি করে দিচ্ছি। নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। আমরা ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবার একটা করেছিলাম। এবার আরও ৩টা আমরা তৈরি করে দিচ্ছি। এভাবে প্রত্যেকটা ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে আমরা একটা করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করব। মানুষকে সেবা দেওয়া, শিক্ষা দেওয়া এবং শিক্ষার দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিয়ে আমরা ফ্যাশন ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয়, নানাধরনের বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় আমরা করেছি। সমুদ্রসীমা আমরা অর্জন করেছি। এই বিষয়ের ওপরে যাতে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে। সেজন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্র গবেষণা বিষয়টা যেমন অন্তর্ভুক্ত করেছি। আবার সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানও আমরা তৈরি করে দিয়েছি কক্সবাজারে। আমরা সারা বাংলাদেশকে অর্থাৎ শুধু রাজধানী বা শহরকেন্দ্রিক না, সমগ্র বাংলাদেশকে উন্নত করতে চাই। সেদিকে লক্ষ রেখে আমাদের কাজ।
আজকে আমরা গবেষণার গুরুত্ব দিয়েছিলাম বলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। আমাদের মৎসে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাংস উৎপাদনও আমরা বৃদ্ধি করতে পেরেছি। বিশ্বে এখন আমরা চতুর্থ স্থানে আছি মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে। তরি-তরকারি, সবজি, ফলমূল উৎপাদনও বৃদ্ধি করেছি। এখন আর আগের মতো কবে শীতকাল আসবে, লাউ খাব, শিম খাব, টমেটো খাব, ফুলকপি খাবÑ বসে থাকতে হয় না। ১২ মাস যাতে উৎপাদন হয়, আমরা গবেষণা করে করে কিন্তু সেটা করতে পেরেছি। কাজেই জনগণের কাছে কথাগুলি নিয়ে যেতে হবে যে, আমরা কী কী কাজ করেছি।
পাট একসময় হারিয়ে যাচ্ছিল। যে পাট আমার সোনালি আঁশ। যে পাট আমার অর্থকরি ফসল। সে পাটকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। জুট মিলগুলি সব বন্ধ করে দিয়েছিল বিএনপি। আমরা আবার তা চালু করে পাটকে গবেষণা করে জুট যেমন আবিষ্কার করেছি। আমরা পাট, পাটজাত পণ্য আরও উৎপাদন করে যেন রপ্তানি করতে পারি, তার ব্যবস্থা নিয়েছি। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আরও উন্নতমানের উৎপাদন করে যেন বিদেশে রপ্তানি করতে পারি, তার ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। অর্থাৎ রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা নতুন নতুর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করছি এবং সারা বাংলাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল আমরা গড়ে তুলছি। সেই জায়গায় বিভিন্ন বিনিয়োগ হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। অর্থনৈতিকভাবে প্রত্যেকটা এলাকা যেন শক্তিশালী হয়। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এবং সাথে সাথে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার দিকে লক্ষ রেখেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে ভোকেশনাল ট্রেনিং এবং বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষার দিকে জোর দিয়েছি, যাতে মানুষ কর্মসংস্থানের সুবিধা পায়। কাজেই আমি আপনাদের কাছে এটুকুই চাইব যে, আমরা এ পর্যন্ত যে কাজগুলি করেছি, সেই কথাগুলি জনগণের কাছে আপনাদের পৌঁছে দিতে হবে। আমরা বিভিন্ন সেøাগান দিচ্ছি, বলছি; কিন্তু আমাদের দলের পক্ষ থেকে এই কথাগুলি মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে যে, আমরা আপনাদের জন্য এই কাজ করেছি এবং করব।
২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে যে ঘোষণা দিয়েছিলাম আমরা, তার থেকে অনেকদূর এগিয়ে গেছি। ২০১৪-এর নির্বাচনী ইশতেহার থেকেও আমরা এগিয়ে গেছি। অনেক কাজেই আমরা আরও বেশি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। কাজেই আওয়ামী লীগ যে কথা দেয়, আওয়ামী লীগ সেই কথা রাখে। সেই কথাটাই মনে রাখতে হবে। আর সেই কথাটাই বলতে হবে। আমাদের সামনে নির্বাচন। সব সব মাথায় রাখতে হবে, নির্বাচন মানেই চ্যালেঞ্জিং হবে। এই নির্বাচন কিন্তু আমাদের একটানা তৃতীয়বার। এই তৃতীয়বারের এই নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবে সকলকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আমি একটা জিনিস লক্ষ করছি, ইতিমধ্যে কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রার্থী হয়ে গেছেন। আর প্রার্থী হয়ে তাদের বক্তব্যে ওই বিএনপি কী লুটপাট করল, সন্ত্রাস করল, দুর্নীতি করল সেটা বলে না। তারা প্রার্থী হয়ে যে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বিএনপি সৃষ্টি করেছে, কয়জন হত্যা করেছে তা বলে না। তার বক্তব্য এসে যায় আমার আওয়ামী লীগের এমপির বিরুদ্ধে। সংগঠনের বিরুদ্ধে। আমি এখানে একটা ঘোষণা দিতে চাই যে, কেউ যদি আমার দলের এত কাজ আমরা করেছি, দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি, আমি কোনো বিয়ে-সাদিতে যাই না, কোনো উৎসবে যাই না, আমার কিছু নাই, আমি সারাদিন-রাত দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি যে, কীভাবে দেশটাকে উন্নত করব। যে উন্নয়নের কাজগুলি করছি সেইগুলি না বলে, সেইগুলি ভুলিয়ে দিয়ে কোথায় কার বিরুদ্ধে কী দোষ আছে সেইটা খুঁজে জনগণের কাছে যারা বলবেন, তারা কখনও আওয়ামী লীগের নমিনেশন পাবেন না। পরিষ্কার কথা। তারা কখনও আওয়ামী লীগের নমিনেশন পাবেন না। কারণ আমি রেকর্ড করছি। আজকে ডিজিটাল বাংলাদেশ। যে যখন বক্তৃতা দেন মোবাইল ধরলেই কিন্তু আমি শুনি। মোবাইল ফোন ধরি না; কিন্তু ম্যাসেজ আমি পড়ি। কোনো ম্যাসেজ বাদ যায় না। এখনও আমার মোবাইল ফোনে বোধহয় দিনে ৪০০-৫০০ ম্যাসেজ আসে। আমি যখনই সময় পাই বসে বসে পড়ি। সমস্যা সমাধানেরও চেষ্টা করি।
আমি এটাই বলব, যারা আমার দলের বিরুদ্ধে কথা বলবে, দলের বিরুদ্ধে বদনাম করবে, সে কী এটা বোঝে না যে, তার ভোটও নষ্ট হবে। সে তাহলে কোন্ মুখে ভোট চাইতে যাবে। যদি এই পাঁচ বছর-পাঁচ বছর ১০ বছর সরকারে থাকার পর যদি দলের বিরুদ্ধে বদনাম করে, তাহলে জনগণ তো তাকেও ভোট দেবে না। এটা হলো বাস্তব কথা। কাজেই সে কথাটা তাকে মনে রাখতে হবে। আমরা যে উন্নয়নটা করেছি, সেটা অবশ্যই বলতে হবে। হ্যাঁ, প্রার্থী হতে পারে। অবশ্যই প্রার্থী হবার অধিকার সকলেরই আছে। কিন্তু সেই প্রার্থী হতে যেয়ে আমার দলকে বদনামে ফেলবেÑ এটা কোনোমতেই আমি মেনে নেব না। এটা সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। আর আমাদের যারা সংসদ সদস্য, তাদেরকে আমি বলব যে, একটা কথা মনে রাখেন যে জনগণ কিন্তু খুব হিসাবি। কেউ দুর্নীতি করলে জনগণ কিন্তু সেটা ঠিকই মাথায় রাখে। সেটা কিন্তু ভুলে যায় না। কাজ করতে যেয়ে টাকা নিলে এরপর ভোট চাইতে গেলে বলবেÑ টাকা দিয়ে কাজ নিছি, ভোট দেব কেন। এটাই কিন্তু তারা বলবে। জনগণের এখন চক্ষু খুলে গেছে। এখন ডিজিটাল যুগ। তারা এখন বিশ্বকে জানতে পারে। কাজেই যারা সংসদ সদস্য, হাতে সময় খুব বেশি নাই। কেউ নমিনেশন পাবেন কী পাবেন নাÑ সেটা নির্ভর করে আপনার এলাকায় আপনারা কারা কতটুকু জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছেন, আর কতটুকু আমাদের নেতাকর্মী, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীকে কতটুকু মূল্যায়ন করেছেন, সেটাও আমি বিবেচনা করব। কারণ আমি এটা মনে করি যে, এই আওয়ামী লীগের ওপর অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে। এটা আমি আমার ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। আমার ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, আমার বাবা জেলের বাইরে থাকলে কী চেহারা আর ভিতরে থাকলে কী চেহারা। আমি তো দেখেছি ৬-দফা দেবার পরে ৮-দফায় কে গেল, ৬-দফায় গেল সেটাও আমার দেখা। ওই ’৫৮-র মার্শাল ল’র পর কী অবস্থা সেটাও আমি দেখেছি। কাজেই আমি এটুকুই বলব যে, দুঃসময়ে যারা আমার নেতাকর্মী, দুঃসময়ে দলের হাল ধরে যারা রাখে। কথায় বলে, ‘সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হায়, দুঃসময়ে হায় হায় কেহ কারো নয়।’ কাজেই এটা মনে রাখতে হবে, ওই দুঃসময়ের কর্মীরা তারা যেন অবহেলিত না হয়। কারণ এখন তো অনেকেই আসবে। আমি আরেকটা সার্ভে করে বের করছি, যেহেতু আমরা ক্ষমতায়, বিভিন্ন দল থেকে অনেকেই ছুটে আসে দলে আসতে। আর গ্রুপ করার জন্য কোনো বাছ-বিচার নাই। যাকে পাচ্ছে তাকে নিয়ে নিজের শক্তি দেখাতে চায়। এরা আসে মধু খেতে। এরা আপনার সাথে থাকতে আসে না, আপনার সাথে কাজ করতে আসে না। আর আসে যারা ওই আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে, সন্ত্রাস করেছে, আমার নেতাকর্মীর ওপর হামলা করেছে, ঘরবাড়ি ভেঙেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছেÑ ভাবে যে, এখানে আসলে মামলা থেকে বাঁচতে পারবে। আর আসে কারা, যারা মনে করে যে ক্ষমতার সাথে থাকতে পারলে পয়সা বানাতে পারব, তারা।
একটা সার্ভে সারা বাংলাদেশে করেছি যে, কাদের কাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, কারা আমার দলে এসেছে। সেই তালিকা আমার কাছে আছে। আমি বলব, কেউ যদি তাদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, এখনই তাদের বিদায় করেন। কারণ তারা দুঃসময়ে থাকবে না; বরং আমি বলব, অনেকেই আসবে আপনাদের মধ্যে কোন্দল করে, তারাই খুন করবে। নাম হবে দল দলকে খুন করেছে। এই দুরভিসন্ধি নিয়েও কিন্তু অনেকে আসে। এইসব বিষয়গুলি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে যথেষ্ট সজাগ থাকতে হবে। যথেষ্ট সহনশীল হতে হবে। আপনি এটা মনে করবেন না, দলের লোক আপনার আপন না। ওই বাইরের একজন আপনার আপন হয়ে গেছে। সে কিন্তু আপন হবে না। আপনারে আপনি চিনতে হবে। নিজের যারা তাদেরকে চিনতে হবে। কাজেই এটা মাথায় রেখেই আপনাদের চলতে হবে।
আওয়ামী লীগ সম্পদ গড়ার জন্য না। বিলাস-ব্যাসনের জীবনযাপন করবার জন্য না। আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শ হচ্ছে জনগণের সেবক। জনগণের সেবা করা, জনগণের কাজ করা, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা। ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এটা মাথায় রাখতে হবে। কাজেই লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা যেন আবার ধ্বংসের মুখে না যায়। ইতিমধ্যে আমরা জাতির পিতার হত্যাকারী, যে হত্যাকারীদের জিয়াউর রহমান পুরস্কৃত করেছিল ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স দিয়ে। যাকে বিচারের হাত থেকে রেহাই দিয়েছিল খালেদা জিয়া। সেই ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোট চুরি করে পার্লামেন্টে বসিয়ে বিরোধী দলের নেতা বানিয়েছিল। আমরা কিন্তু সেই খুনিদের বিচার করে তাদের বিচারের রায় কার্যকর করেছি। যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। জিয়াউর রহমান এসে এক কলমের খোঁচায় মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্স দিয়ে, সেই বিচার বন্ধ করে দিয়ে, সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে তাদের মন্ত্রী বানায়, উপদেষ্টা বানায়, প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল। আমরা সরকারে এসে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আবার করেছি। বিচারের রায়ও আমরা কার্যকর করেছি। যারা সাক্ষী দিয়েছে, আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু তাদের ওপরও অনেক সময় অত্যাচার নেমে আসে। কাজেই তাদেরকে সবরকমের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। তাদের আপনারা নিরাপত্তা দেবেন। তাদের পাশে আপনারা থাকবেন, যাতে তাদের ক্ষতি যেন কেউ করতে না পারে।
আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কী পেলাম, কী পেলাম নাÑ সেই হিসাব না করে, দেশকে কী দিতে পারলাম, দেশের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, আগামীতে কতটুকু করব, আগামীতে কী দিতে পারবÑ সেই কথাটা মাথায় রেখে ত্যাগের মনোভাব নিয়েই আপনাকে কাজ করতে হবে। যেন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে। আওয়ামী লীগ আমরা জোট করেছি। মহাজোট করেছি। হ্যাঁ, নির্বাচনের স্বার্থে করতে হয়েছে। আগামীতেও আমরা করব। আমরা বন্ধু হারাব না। সবাইকে নিয়েই করতে চাই। কারণ ওইটুকু আত্মত্যাগ আমাদের করতে হবে। আমরা সেটা করব। কিন্তু সেই সাথে সাথে আওয়ামী লীগের দায়িত্বটা অনেক বেশি। কারণ আওয়ামী লীগ এ দেশের সবচেয়ে বড় দল। সব থেকে জনসমর্থন বেশি। কাজেই সেটা মাথায় রেখে এই নির্বাচনে যাকে আমরা নৌকা মার্কা দেব, যাকে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী করব, তার পক্ষে সকলকে কাজ করতে হবে। আপনাদের এখন থেকে জনগণের কাছে যেতে হবে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্য। কে প্রার্থী, কে প্রার্থী নাÑ সেটা বড় কথা না। নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্যই জনগণের কাছে যেতে হবে। কারণ নৌকা মার্কা পেলেই কিন্তু এ দেশের মানুষ কিছু পায়। ভাষার অধিকার পেয়েছে। স্বাধীনতা পেয়েছে। আজকে দারিদ্র্য মুক্তি পাচ্ছে। শিক্ষার আলো পাচ্ছে। বিজলি বাতি পাচ্ছে। আজকে কী না পাচ্ছে? রাস্তাঘাট পাচ্ছে। কত হাজার হাজার একর রাস্তাঘাট করে দিয়েছি। পুল-ব্রিজ করে দিচ্ছি। আমরা সারাদেশের উন্নয়ন করছি। আন্তর্জাতিকভাবে আজকে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা আশ্রয় চেয়েছে। ’৭১ সালের কথা আমার মনে পড়েছে। যখন এরা নির্যাতিত অবস্থায় আমাদের দেশে আসতে শুরু করল, রেহানা তখন ঢাকায়। রেহানা শুধু আমাকে বলল, একবার চিন্তা করো, ’৭১ সালের কথা। চিন্তুা করো ’৭৫ সালের কথা। আমাদেরকে এভাবে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আমরাও নির্যাতিত হয়েছিলাম। আমাকে সোজা ও বলল, ১৬ কোটি মানুষকে ভাত খাওয়াও। ওই ৫-৭ লক্ষ মানুষকে ভাত খাওয়াতে পারবা না? আমি বলেছিলাম, অবশ্যই পারব। আর তুমি যখন বলেছ তখন তো আমি অবশ্যই করব। কারণ আমার বাপ-মা মরা ওই ছোটবোন। তার কথা আমি ফেলতে পারব না। আমরা দুজন ছুটে গেছি সেখানে। সেখানে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি। শুধু তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে আমার স্থানীয় জনগণ অনেকেই চাষাবাদ করতে পারে না, অনেকেই কাজ করতে পারে না, অনেকের সমস্যা, তারা যাতে সমস্যায় না পড়ে, তাদেরও খাদ্যের ব্যবস্থা করেছি। এই ঈদ উপলক্ষে তাদের জন্য বিশেষভাবে ঈদ উপহার পাঠানো, তাদের কাজের ব্যবস্থা, তাদের দেখাশোনাটা, কক্সবাজার এলাকায় যারা আছে জনগণ, তাদের জন্যও কিন্তু আমরা সব ব্যবস্থা নিচ্ছি। তারা যেন কোনোরকম কষ্ট না পায়। এদেরকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি; কিন্তু আমার স্থানীয় যারা তারাও যেন কোনো কষ্ট না পায় সেদিকেও দৃষ্টি রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
আমি এটুকুই বলব, এত কাজ আমরা করেছি। যেভাবে দেশের আমরা উন্নয়ন করেছি। এই উন্নয়ন করার ফলে কোনোমতেই মানুষ যে নৌকায় ভোট দেবে না, তা কিন্তু হয় না। যদি না দেয় তার জন্য দায়ী থাকবেন আপনারা। তণমূলে এটাই আমার কথা। কারণ আপনারা সঠিকভাবে মানুষের কাছে যেতে পারেন নি। বলতে পারেন নি। বোঝাতে পারেন নি। সেবা দিতে পারেন নি। সেই জন্যই। নইলে এখানে হারার তো কোনো কথা না। কারণ এত উন্নয়ন বাংলাদেশে কবে হয়েছে? কোন্ সরকার করতে পেরেছে? কোনো সরকার করে নাই। তাহলে কেন অন্যদল ভোট পাবে? কেন ওই বিএনপি, যারা এ দেশে হত্যা, খুন, মানুষ পুড়িয়ে মারা, দুর্নীতি করা, এতিমের টাকা মেরে খাওয়া, যারা জুয়া খেলে না-কি অর্থ উপার্জন করে। যেখানে জাতির পিতা মদ-জুয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আজকে শোনা যায় পত্রিকায় আসে যে, জুয়া খেলে অর্থ উপার্জন করে। ওই জুয়াড়–, ওই মাদক, এতিমের অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতিÑ এই সমস্ত কর্মকা-ে, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের সাথে যারা জড়িত, তারা কেন ভোট পাবে? সেই দল কেন ভোট পাবে? আমি এই প্রশ্নের উত্তর পাই না যে তারা কেন ভোট পাবে। কাজেই এখানে আপনাদের বিরাট দায়িত্ব।
আজকে আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মানুষের সেবা করে যাচ্ছে। একটু স্মরণ করে দেখেন, কত মানুষ জীবন দিয়ে গেছে এই সংগঠন করতে যেয়ে। এই দেশ স্বাধীন করতে যেয়ে। জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে যেয়ে। তাদের ত্যাগের কথাটা একটু স্মরণ করুন। আর্থিকভাবে তো বাংলাদেশের মানুষ স্বচ্ছল হচ্ছে এখন। আরও স্বচ্ছল হোকÑ আমরা সেটা চাই। কাজেই সেটা মনে রেখেই আপনাদেরকে কাজ করতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে। উন্নয়নের যে কাজগুলো আমরা করেছি, এক এক করে মানুষের কাছে যেয়ে বলতে হবে যে, আপনাদের জন্য আমরা এটা করেছি। আমরা আরও করে দেব। একটি মানুষও দরিদ্র থাকবে না। একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। একটি মানুষও বিনাচিকিৎসায় থাকবে না। একটি মানুষও নিরক্ষর থাকবে না। আমরা ঠিক সেইভাবে বাংলাদেশকে গড়ব। যে বাংলাদেশ জাতির পিতা চেয়েছিলেনÑ ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ।
২০৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। সেইভাবে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলব। সেই পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। আমরা ২০১০-২০২০ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। আমি ইতিমধ্যে শুরু করেছি ২০২১ থেকে ২০৪১ পর্যন্ত প্রেক্ষিত পরিকল্পনার খসড়া, ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা শুরু করেছি। যে বাংলাদেশ কী কী কাজ করলে আমরা উন্নত দেশ হতে পারব। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছি। যেন কোনোমতেই আর আমরা পেছনে না ফিরে তাকাই।
কিন্তু যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, ওই জামাত ক্ষমতায় আসে, ওই যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায় আসে। তাহলে এই দেশকে তারা ধ্বংস করবে। কারণ তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিশ্বাস করে না। অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না। যে উন্নয়ন আমরা করেছি সেগুলি সব শেষ করে লুটপাট করে খেয়ে যাবে। কাজেই সেটা মাথায় রেখে সবাইকে কাজ করতে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি। দলের মধ্যে ঐক্য রাখবেন। ত্যাগের মনোভাব নিয়ে কাজ করবেন। নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। ওই ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, সেইভাবে কেউ জিততে পারবেন না। জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আপনাকে আপনার কাজে খুশি হয়ে ভোট দেবে। যাকে আমি প্রার্থী করব, সেইভাবেই ভোট হবে। জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। কারণ আমরা আজকে নির্বাচনের স্বচ্ছতাÑ স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে যা করেছি আমরাই। আমাদেরই প্রস্তাবেই হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ আমরা যে মহাজোট করেছিলাম, সেখানেই আমরা এই প্রস্তাবগুলি দিয়ে করেছি। কাজেই নির্বাচন যেন স্বচ্ছ হয়। নির্বাচন নিয়ে যেন কেউ কোনো কথা বলতে না পারে।
আপনারা একটু স্মরণ করেন, ’৯৬ সালে বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন করেছিল। ওই ইলেকশনে যেহেতু জনগণ ভোট দেয় নাই, তাই আন্দোলন করে। ৩০শে মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। ভোট চুরির অপরাধ নিয়েই কিন্তু তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। আবার ২০০৬ সালের নির্বাচন তখনও একই অবস্থা। আমি এটুকু বলব যে, আমরা এই বদনাম নিতে চাই না। জনগণের মন জয় করে তাদের ভোট নিয়েই ক্ষমতায় আসতে হবে। ক্ষমতায় আসতে হবে এই কারণেই যে, আমাদের উন্নয়নের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে যেন বাংলাদেশকে আমরা ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসাবে গড়তে পারি। সেটা মাথায় রেখেই আমাদের কাজ করতে হবে। আমি আপনাদেরকে এই দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে বক্তব্য শোনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আবারও আমি বলি, আপনারা গণভবনে এসেছেন, আমার গণভবনের মাটি ধন্য হয়েছে। আপনাদের জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা রেখেছি দুপুরে। আমি চাই, আপনারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাবেন এবং আমাদের এই উন্নয়নের কথাগুলি জনগণের কাছে তুলে ধরবেন। জনগণ যেন আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রেখে ভোট দিয়ে আবার আমাদেরকে নির্বাচিত করে, দেশ সেবার সুযোগ দেয়। সেই দিকে লক্ষ রেখে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন। সেটাই আমি চাই। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি।

খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

 

সৌজন্যেঃ উত্তরণ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মুখপত্র 

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *